বনায়নের জমি নিয়ে বিরোধ, অপহরণ–নির্যাতনের তিন দিন পর হত্যা মামলা


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : জুলাই ৪, ২০২৬, ৮:১২ পূর্বাহ্ন /
বনায়নের জমি নিয়ে বিরোধ, অপহরণ–নির্যাতনের তিন দিন পর হত্যা মামলা

সরকারি বনায়নের জায়গা দখল নিয়ে বিরোধের জেরে অপহরণ ও নির্মম নির্যাতনের শিকার নুরুল ইসলাম প্রকাশ নুরু (৩৬) আর বেঁচে নেই।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ না পেয়ে নগরীর মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৮ জুন সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর গত বুধবার রাতে সাতকানিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের ছোট ভাই মো. শাহ আলম বাদী হয়ে এই মামলাটি করেন।

মামলায় চারজনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে আরও সাত-আটজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

এজাহারনামীয় আসামিরা হলেন— আকবর হোসেন বাঁচা, মো. হারুন, মো. ফোরকান এবং নির্মমভাবে নিহত নুরুলের নিজের সহোদর ভাই মো. ওসমান।

তবে মামলার চার দিন পার হলেও এখনো কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাতকানিয়ায় সরকারি বনায়নের জায়গা দখল করা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আসামিদের সঙ্গে নুরুল ইসলামের তীব্র বিরোধ চলছিল।

এর জেরে গত ২৩ জুন আসামিরা নুরুল ও তাঁর স্ত্রীকে ব্যাপক মারধর করে। এই ঘটনার পর নুরুল ইসলাম সাতকানিয়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

থানায় অভিযোগ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ। পরদিন ২৪ জুন কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে বড়দুয়ার ফরেস্ট অফিসের সামনে থেকে নুরুলকে প্রকাশ্য দিবালোকে অপহরণ করা হয়।

অপহরণের পরদিন ২৫ জুন বান্দরবান থানা পুলিশের সহযোগিতায় গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় নুরুলকে উদ্ধার করা হয়।

বাদী শাহ আলম জানান, মৃত্যুর আগে আইসিইউর লাইফ সাপোর্টে যাওয়ার পূর্বে নুরুল তাঁর কাছে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে গেছেন।

“ভাই আমাকে বলেছিলেন, অপহরণের পর তাকে হারিচ্চার ডেবা এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করা হয় এবং লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে মৃত ভেবে দুর্বৃত্তরা তাঁকে বান্দরবানের সুয়ালক মাঝেরপাড়া ব্রিজের নিচে ফেলে রেখে যায়।”

শাহ আলম আরও জানান, মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে তাঁর ভাই যেসব ঘাতকদের নাম বলে গেছেন, তা মোবাইল ফোনের ভিডিওতে ধারণ করে রাখা হয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

উদ্ধারের পর প্রথমে নুরুলকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে এবং পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কিন্তু সেখানে কোনো আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) শয্যা খালি না থাকায় স্বজনরা তাঁকে দ্রুত নগরীর মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮ জুন সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর মামলা করতে তিন দিন বিলম্ব হওয়ার পেছনে এক অভিনব আইনি জটিলতার কথা জানান বাদী শাহ আলম।

তিনি বলেন, “ঘটনা ঘটেছে সাতকানিয়ায়, আর আমার ভাইকে উদ্ধার করা হয়েছে বান্দরবান থেকে।

এই দুই থানার সীমানা ও ঘটনাস্থল নিয়ে আইনি টানাপোড়েনের কারণে প্রথম দিকে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। পরে সাতকানিয়া থানা মামলাটি গ্রহণ করে।”

নিহত নুরুল ইসলাম ছিলেন তাঁর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর আকস্মিক ও নির্মম মৃত্যুতে তাঁর স্ত্রী এবং তিন নাবালক কন্যাসন্তান সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বিলাপ করতে করতে শাহ আলম বলেন, “আমার ভাইয়ের তিনটা ছোট ছোট মেয়ে। এখন ওদের কে দেখবে? আমরা এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসি চাই।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “সরকারি বনায়নের জায়গা নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।

এজাহারভুক্ত আসামিরা পলাতক রয়েছে। তবে তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”