
মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে তখন স্নায়ুর চরম পরীক্ষা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের লড়াই শেষ, অতিরিক্ত সময়েরও খেলা চলছে। ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়েছে ১১১ মিনিট।
ঠিক তখনই জাদুকরী এক গোল করে আর্জেন্টিনাকে উল্লাসে ভাসালেন ক্রিশ্চিয়ানো রোমেরো। আর এই গোলেই নবাগত কেপ ভার্দের রূপকথা থামিয়ে ৩-২ ব্যবধানের রুদ্ধশ্বাস এক জয় তুলে নিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
এই জয়ের ফলে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করে ফেলল লিওনেল স্কালোনির দল, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ মিশর।
ম্যাচ শুরুর আগেই ফুটবল পণ্ডিতদের ধারণা ছিল—বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলতে এলেও কেপ ভার্দে মোটেও সহজ প্রতিপক্ষ হবে না আর্জেন্টিনার জন্য।
মাঠে ঘটল ঠিক সেটাই। ম্যাচজুড়ে একের পর এক নাটকীয়তা, গোল আর পাল্টা গোলের রোমাঞ্চে বুঁদ হয়ে রইলেন ফুটবলপ্রেমীরা।
মেসির রেকর্ড ও প্রথমার্ধের আধিপত্য খেলার শুরুতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আর্জেন্টিনার হাতে থাকলেও রক্ষণাত্মক কেপ ভার্দের দেয়াল ভাঙা সহজ ছিল না।
উল্টো প্রথম বিপজ্জনক আক্রমণটি এসেছিল আফ্রিকার দলটির পক্ষ থেকেই। তবে ধীরে ধীরে চেনা ছন্দে ফেরে আলবিসেলেস্তেরা।
১৫ মিনিটে থিয়াগো আলমাদার পাস থেকে সুযোগ পেয়েছিলেন লিওনেল মেসি। দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নেওয়া তাঁর শটটি অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়। ১৮ মিনিটে তাঁর একটি ফ্রি-কিকও রুখে দেন কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা।
অবশেষে ২৯ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের অসাধারণ এক লং পাস বক্সের ভেতরে নিয়ন্ত্রণে নেন মেসি।
দুর্দান্ত প্রথম স্পর্শের পর নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ভোজিনহাকে পরাস্ত করে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়াল ৭-এ, আর সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোল হলো ২০টি।
একই সঙ্গে টানা আট বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তি গড়ার পাশাপাশি ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে সর্বোচ্চ ১২টি সরাসরি গোল-অবদানের (৬ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট) রেকর্ডও নিজের করে নিলেন এই মহাতারকা।
কেপ ভার্দের প্রত্যাবর্তন ও অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তা ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করার পর এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার ও ডি পলেরা মাঝমাঠের দখল ধরে রাখেন।
কিন্তু আফ্রিকার নবাগত দলটি ধৈর্য হারায়নি। রক্ষণ সামলে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল তারা। ৫৯ মিনিটে ডেরয় দুয়ার্তের দুর্দান্ত এক গোল মায়ামির স্টেডিয়ামে স্তব্ধতা নামিয়ে আনে। ১-১ গোলে সমতায় ফেরে কেপ ভার্দে।
সমতায় ফেরার পর আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ সাজালেও গোলমুখ খুলতে পারছিল না। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে ৮ মিনিট ইনজুরি টাইম দেওয়া হলেও কেপ ভার্দের রক্ষণ ভাঙা সম্ভব হয়নি। ফলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরু হতেই যেন নতুন প্রাণ পায় আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ের মাত্র ২ মিনিটে (৯২ মিনিট) লিসান্দো মার্তিনেজ গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন।
কিন্তু নাটকের তখনও অনেক বাকি ছিল। সিদনি লোপেজ ক্যাবরালের এক দুর্দান্ত শটে আবারও ২-২ গোলে সমতায় ফেরে লড়াকু কেপ ভার্দে।
যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি টাইব্রেকারের দিকেই যাচ্ছে, ঠিক তখনই ১১১ মিনিটে ক্রিশ্চিয়ানো রোমেরোর সেই জয়সূচক গোল। শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলের এই কষ্টার্জিত কিন্তু রোমাঞ্চকর জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।
বিশ্বকাপে অভিষিক্ত কেপ ভার্দে বিদায় নিলেও বুক চিতিয়ে লড়াই করে ফুটবল বিশ্বের মন জয় করে নিয়েছে।
আর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আরেকবার প্রমাণ করল, স্নায়ুচাপ ধরে রেখে কীভাবে জয় ছিনিয়ে আনতে হয়।
মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ের আগে এই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জন্য নিশ্চিতভাবেই বড় এক সতর্কতা বার্তা।






















আপনার মতামত লিখুন :