জায়হানের শেষ দুই দিন: অপহরণ, মুক্তিপণ, তারপর মৃত্যু


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : জুন ১৮, ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ন /
জায়হানের শেষ দুই দিন: অপহরণ, মুক্তিপণ, তারপর মৃত্যু

দুই দিন ধরে ছেলেকে খুঁজছিলেন বাবা শাহজাহান। কখনো পুকুরপাড়ে, কখনো আশপাশের গলি-রাস্তায়, কখনো আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে।

এলাকার মানুষও খুঁজেছেন। কেউ টর্চ হাতে, কেউ লাঠি হাতে, কেউ আবার সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, “পাওয়া যাবে, চিন্তা করবেন না।”

কিন্তু যে শিশুটিকে খুঁজে পেতে সবাই ব্যস্ত ছিল, সে তখন আর বেঁচে ছিল না—এমন অভিযোগই এখন সামনে এসেছে।

চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দার খীল এলাকার পূর্বপাড়া গ্রামে পাঁচ বছর বয়সী শিশু মো. জায়হানের মৃত্যুর ঘটনা যেন একসঙ্গে শোক, বিস্ময় ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।

কারণ, অভিযোগ উঠেছে—যারা পরিবারের সঙ্গে মিলে জায়হানকে খুঁজেছে, সন্দেহের তীর শেষ পর্যন্ত ঘুরে গেছে তাদের দিকেই।

জায়হান ছিল স্থানীয় গ্যারেজ ব্যবসায়ী শাহজাহানের একমাত্র সন্তান। পরিবারের স্বপ্ন, আদর আর ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দু। এলাকার একটি নূরানী মাদ্রাসায় পড়ত সে। ছোট্ট শরীরে ছিল অগণিত দুষ্টুমি, অজস্র প্রশ্ন আর সীমাহীন কৌতূহল।

গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুর ১২টার দিকে বাড়ির সামনের রাস্তায় খেলছিল জায়হান। গ্রামের অন্য দিনের মতোই ছিল সেদিনও। কিন্তু হঠাৎ করেই সে উধাও হয়ে যায়।

প্রথমে পরিবারের ধারণা ছিল, হয়তো পাশের পুকুরে পড়ে গেছে শিশু। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে উৎকণ্ঠা। পুকুরে নামে লোকজন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে খোঁজ। কিন্তু কোথাও নেই জায়হান।

দিন গড়াতে শুরু করলে উদ্বেগ আরও বাড়ে। থানায় করা হয় সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। পরিবারের সদস্যদের চোখে তখনও একটাই আশা—কোথাও না কোথাও জীবিত আছে তাদের সন্তান।

কিন্তু বিকেল তিনটার দিকে পরিস্থিতি বদলে যায়।

শাহজাহানের শয়নকক্ষের বিছানায় পাওয়া যায় একটি হাতে লেখা চিঠি। সেখানে লেখা ছিল, “তোর ছেলে আমাদের কাছে আছে…”। এরপর দাবি করা হয় তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ। সঙ্গে পরিবারের একজনের আনলক করা মোবাইল ফোন নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আসার নির্দেশও দেওয়া হয়।

চিঠিটি হাতে পাওয়ার পর পরিবারের উদ্বেগ ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। নিখোঁজের ঘটনা তখন অপহরণের ঘটনায় পরিণত হয়।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চিঠিটি জব্দ করে। শুরু হয় তদন্ত। প্রযুক্তির সহায়তায় খোঁজা হতে থাকে সূত্র।

এদিকে গ্রামে চলতে থাকে জায়হানকে খুঁজে ফেরার অভিযান।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই খোঁজাখুঁজিতে অংশ নিয়েছিল পাশের বাড়ির লোকজনও। কেউ পরামর্শ দিয়েছেন, কেউ সান্ত্বনা দিয়েছেন, কেউ সম্ভাব্য জায়গা দেখিয়ে বলেছেন—“এখানে খোঁজেন।”

কিন্তু দুই দিন পর যে দৃশ্য সামনে আসে, তা যেন পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দেয়।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভোরে শিশুটির বাড়ির পাশের একটি ময়লার ভাগাড় থেকে উদ্ধার করা হয় বস্তাবন্দি মরদেহ।

পুলিশ জানায়, মরদেহটি উদ্ধার হয়েছে আটক ব্যক্তিদের বসতঘরের পেছনের অংশ থেকে।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক করা হয়েছে একই পরিবারের পাঁচ সদস্য—মো. সাইফুল, শাহানুর, নিহা, নিহান ও ওয়াসিফাকে।

স্বজনদের অভিযোগ, টাকার লোভেই অপহরণ করা হয়েছিল শিশুটিকে। পরে পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়। এরপর মরদেহ বস্তায় ভরে ময়লার ভাগাড়ে ফেলে রাখা হয়।

এই অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তাধীন। তবে অভিযোগের বর্ণনা শুনেই শিউরে উঠছেন এলাকার মানুষ।

সবচেয়ে মর্মান্তিক প্রশ্নটি এখন ঘুরপাক খাচ্ছে গ্রামজুড়ে—যদি সত্যিই প্রতিবেশীরা এ ঘটনায় জড়িত হয়ে থাকে, তাহলে খোঁজাখুঁজির সেই দৃশ্যগুলোর অর্থ কী?

একজন স্বজন বলেন, “যাদের সঙ্গে বসে আমরা কেঁদেছি, যাদের সামনে বারবার বলেছি আমার বাচ্চাটাকে খুঁজে দেন, তারাই যদি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে এটা শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, এটা বিশ্বাসকে হত্যা করা।”

নিহত শিশুর মামা ওয়াজেদ আলী জিসানের কণ্ঠেও ছিল একই বেদনা।

তিনি বলেন, “আমার ভাগিনাকে এভাবে ফিরে পাবো কখনো ভাবিনি। যারা আমাদের সঙ্গে খোঁজাখুঁজি করেছে, একই বাড়িতে বসবাস করেছে, তারাই তাকে হত্যা করেছে—এটা মেনে নেওয়া খুবই কষ্টের।”

ঘটনার পর পূর্বপাড়া গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ছোট্ট জায়হানের খেলাধুলার জায়গা, তার হাঁটার পথ, তার পরিচিত মুখগুলো এখন যেন নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক নির্মম পরিণতির সামনে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী জানিয়েছেন, উদ্ধার করা মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত চলছে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

কিন্তু তদন্তের আনুষ্ঠানিক ফল যাই আসুক, একটি বাস্তবতা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—পাঁচ বছরের এক শিশুর জীবন থেমে গেছে এমন এক ঘটনার মধ্যে, যা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে নাড়া দিয়েছে।

জায়হানের বাবা-মা হয়তো এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না, যে সন্তানকে দুই দিন ধরে জীবিত ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, সে এত কাছে ছিল—তবু কত দূরে।

আর ময়লার ভাগাড়ের সেই বস্তা যেন শুধু একটি শিশুর মরদেহ নয়, লুকিয়ে রেখেছিল মানুষের মুখোশের আড়ালে থাকা ভয়ংকর এক অন্ধকারের গল্প।