ডিসি জাহিদের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসায় ব্যবসায়ী, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্লা বাহিনী


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : জুন ২৭, ২০২৬, ৯:৩৮ অপরাহ্ন / ০ Views
ডিসি জাহিদের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসায় ব্যবসায়ী, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্লা বাহিনী

বাংলাদেশে উৎসব এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার অভিযোগ নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে চট্টগ্রামে নেওয়া হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ—‘উৎসবে কমবে দাম, বাড়বে আনন্দ’ স্লোগানে ‘ফেস্টিভ সেল’ কর্মসূচি।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাস্তবায়িত এই কর্মসূচি শুধু বাজারে স্বস্তি ফেরায়নি, বরং ব্যবসায়ী, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কাস্টমস, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে একটি নতুন সামাজিক ও ব্যবসায়িক সংস্কৃতির সূচনাও করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সেই সফলতার স্বীকৃতি দিতে শনিবার (২৭ জুন) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত হয় সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বক্তারা একে শুধু একটি কর্মসূচির সাফল্য নয়, বরং জনকল্যাণভিত্তিক নতুন একটি সংস্কৃতির সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, বাংলাদেশে সম্ভবত এই প্রথম ব্যবসায়ীদের পণ্যের দাম কমানোর জন্য সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, “এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি নতুন সংস্কৃতির সূচনা। ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এই উদ্যোগের পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।”

র‍্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ভালো কাজে অনেকেই অংশ নেন, কিন্তু উদ্যোগটি কাউকে না কাউকে নিতে হয়। জেলা প্রশাসক সেই উদ্যোগ নিয়েছেন বলেই সবাই একসঙ্গে এই সফলতা উদযাপন করতে পারছেন।

তিনি বলেন, এই উদ্যোগ শুধু চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা জনকল্যাণমূলক একটি প্ল্যাটফর্মে একসঙ্গে কাজ করেছেন। এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।

রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ের পুলিশ সুপার চাউলাউ মারমা বলেন, “বাজারকে শুধু আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীরা যদি দায়িত্ববোধ থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ান, তাহলেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।”

ডিজিএফআইয়ের উপ-পরিচালক নরুল হক বলেন, খাতুনগঞ্জে আদার সংকট দেখা দিলে জেলা প্রশাসকের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপ দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায়। এতে প্রমাণ হয়েছে, রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

ঈদের আগে বাজার পরিদর্শনের সময় আদার সরবরাহ সংকটের বিষয়টি সামনে আসে। এরপর জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ইমরান হোসেন জানান, জেলা প্রশাসকের অনুরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে ৪১টি কনটেইনারের আদা বাজারে আসে। এতে শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশের বাজারেই আদার দাম কমে যায় এবং স্বস্তি ফিরে আসে।

কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের কমান্ডার আবু নেছার সালেহ আহমেদ বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সমুদ্রে কোস্ট গার্ড নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনস্বার্থমূলক উদ্যোগে তাঁরা জেলা প্রশাসনের পাশে থাকবেন।

চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আবু হায়দার বলেন, বাজারদর নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের সম্মাননা দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যবসায়ীদের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে।

চট্টগ্রামের একটি সুপারমার্কেটের কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠান কোরবানিসংশ্লিষ্ট ৮৭টি পণ্যের দাম কমিয়েছে।

অন্যদিকে খুলশি মার্টের মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে ৮৩টি পণ্যে ৫ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের ইতিবাচক সাড়া ভবিষ্যতেও এমন উদ্যোগ নিতে উৎসাহ জোগাবে।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “ক্ষমতা কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে কোনো ব্যবস্থা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। একটি সংস্কৃতি তখনই যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে, যখন মানুষ সেটিকে মূল্যবোধ দিয়ে ধারণ করে।”

তিনি বলেন, ‘ফেস্টিভ সেল’ শুধু পণ্যের দাম কমানোর কর্মসূচি নয়; এটি ব্যবসায়িক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনকল্যাণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার একটি প্রয়াস।

জেলা প্রশাসক বলেন, চট্টগ্রাম দেশের ব্যবসা ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। জাতীয় অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই চট্টগ্রাম যদি ইতিবাচক ব্যবসায়িক সংস্কৃতির নেতৃত্ব দেয়, তার প্রভাব সারা দেশেই পড়বে।

তিনি আরও বলেন, “এই সফল কর্মসূচির মাধ্যমে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আবারও প্রমাণ করেছেন, তাঁরা কোনো সিন্ডিকেট সংস্কৃতির প্রতিনিধি নন। তাঁরা মূল্যবোধকে ধারণ করেন, জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন এবং ব্যবসাকে একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে দেখেন।”

জেলা প্রশাসক জানান, নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে প্রথম তাঁর মাথায় উৎসবকেন্দ্রিক মূল্যছাড়ের ধারণাটি আসে। তবে সেখানে তা বাস্তবায়নের সুযোগ হয়নি।

পরে চট্টগ্রামে যোগ দেওয়ার পর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেন তিনি।

তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের বহু দেশে উৎসব মানেই মূল্যছাড়। অথচ বাংলাদেশে উৎসব এলেই বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। সেই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানের শেষে ‘ফেস্টিভ সেল’ কর্মসূচি সফল বাস্তবায়নে বিশেষ অবদান রাখায় ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসক বলেন, “আজকের সম্মাননা কোনো পুরস্কার নয়; এটি কৃতজ্ঞতার প্রতীক। এর মধ্যে রয়েছে আন্তরিকতা, শ্রদ্ধা এবং ভালো কাজের স্বীকৃতি।”

অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তাদের অভিন্ন মত ছিল, চট্টগ্রামে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ কেবল একটি সফল কর্মসূচি নয়; এটি একটি নতুন সামাজিক দর্শন। মূল্যবোধ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং জনকল্যাণকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি একদিন সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আর যদি তা হয়, তাহলে ‘উৎসবে কমবে দাম, বাড়বে আনন্দ’—এই স্লোগান হয়তো একদিন শুধু চট্টগ্রামের নয়, হয়ে উঠবে পুরো বাংলাদেশের উৎসব-সংস্কৃতির নতুন পরিচয়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি