১৩ দানবাক্স, ৪৩ বস্তা টাকা-পাগলা মসজিদে আবারও নজির


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : জুন ২৭, ২০২৬, ৩:২১ অপরাহ্ন /
১৩ দানবাক্স, ৪৩ বস্তা টাকা-পাগলা মসজিদে আবারও নজির

কিশোরগঞ্জ শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদে আবারও দেখা গেল মানুষের আস্থা ও দানের এক অনন্য চিত্র।

দীর্ঘ ছয় মাস পর শনিবার (২৭ জুন) সকালে মসজিদের ১৩টি লোহার দানবাক্স খোলা হলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে ৪৩ বস্তা ভর্তি টাকা। এরপর থেকেই শুরু হয়েছে টানা গণনার কর্মযজ্ঞ।

সকাল ৭টায় জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে দানবাক্সগুলো খোলা হয়।

মুহূর্তেই বস্তার পর বস্তা টাকা বেরিয়ে আসার দৃশ্য দেখতে মসজিদ প্রাঙ্গণে তৈরি হয় উৎসুক পরিবেশ।

টাকা গণনার কাজে অংশ নিয়েছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, মসজিদ কমপ্লেক্সের মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পার্শ্ববর্তী জামিয়া ইমদাদিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী এবং রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সাধারণত তিন মাস পরপর দানবাক্স খোলা হলেও এবার রমজান ও জাতীয় নির্বাচনের কারণে ছয় মাস পর দানবাক্স খোলা হয়েছে। ফলে দানের পরিমাণ নিয়েও আগে থেকেই ছিল ব্যাপক কৌতূহল।

দানবাক্স খোলার সময় উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজমুস সাকিব, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইশতিয়াক ইমন এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান।

সোহানা নাসরিন জানান, সর্বশেষ গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দানবাক্স খোলা হয়েছিল। তখন গণনা শেষে পাওয়া গিয়েছিল ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা।

সেই অর্থ রূপালী ব্যাংকে পাগলা মসজিদের হিসাবে জমা করা হয়। একই সঙ্গে পাওয়া সোনা, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা সিলগালা করে জেলা ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে পাগলা মসজিদের তহবিলে জমা রয়েছে ১১৪ কোটি ১৩ লাখ ৭ হাজার ৩৫২ টাকা।

এ ছাড়া মসজিদের নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের মানুষ অনলাইনে অনুদান দিতে পারছেন। এ পর্যন্ত অনলাইনে পাওয়া অনুদানের পরিমাণ ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা।

পাগলা মসজিদকে ঘিরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও জানান জেলা প্রশাসক।

তিনি বলেন, আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। বর্তমান মসজিদ কমপ্লেক্স ও কবরস্থানের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে ৫৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ জমি মসজিদের নামে ক্রয় করা হয়েছে।

নান্দনিক ডিজাইন তৈরির কাজও চলমান। পাশাপাশি আগত মুসল্লিদের সুবিধার্থে মসজিদের বাইরে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজও এগোচ্ছে।

পাগলা মসজিদের বিপুল তহবিল শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই নয়, সামাজিক কল্যাণমূলক কাজেও ব্যয় হচ্ছে।

মসজিদ কমপ্লেক্সের মাদরাসায় অধ্যয়নরত ১৩০ জন এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর যাবতীয় খরচ বহন করা হয় এই তহবিল থেকে।

পাশাপাশি ৩৫ জন কর্মচারী ও ১০ জন আনসার সদস্যের বেতন, বিদ্যুৎ বিল এবং মসজিদের উন্নয়ন ব্যয়ও এখান থেকে মেটানো হয়। তহবিলের লভ্যাংশ থেকে কিশোরগঞ্জ জেলার দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তাও দেওয়া হয়।

এদিকে আজকের বিশাল গণনা কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন জামিয়া ইমদাদিয়া মাদরাসার ৩০০ জন শিক্ষার্থী, পাগলা মসজিদ মাদরাসার ১০৬ জন শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা, মসজিদের ৩৫ জন স্টাফ এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ১৯ জন কর্মী।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সভাপতিত্বে গঠিত সাত সদস্যের একটি উপকমিটি পুরো কার্যক্রম তদারকি করছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিতে মোতায়েন রয়েছেন ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ৪০ জন পুলিশ সদস্য, ৮ জন র‌্যাব সদস্য এবং ২০ জন আনসার সদস্য।

নরসুন্দা নদীর তীরের এই ঐতিহাসিক মসজিদে দানের প্রবাহ বছরজুড়েই অব্যাহত থাকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও মানুষ এখানে অনুদান পাঠান।

সেই আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন যেন আবারও দেখা গেল ১৩টি দানবাক্স খুলে পাওয়া ৪৩ বস্তা টাকায়। এখন সবার নজর শেষ পর্যন্ত গণনা শেষে মোট কত অর্থ পাওয়া যায়, সেই ঘোষণার দিকে।