হাটহাজারী পৌরসভায় বদলির পরও বহাল প্রকৌশলী ফয়সল


Csp Admin প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ৮, ২০২৫, ৬:৫৯ অপরাহ্ন /
হাটহাজারী পৌরসভায় বদলির পরও বহাল প্রকৌশলী ফয়সল

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: হাটহাজারী পৌরসভায় উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ফয়সল আহমদ খানের বদলির পরও কর্মস্থলে বহাল থাকার ঘটনা এখন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ তাকে রাউজান পৌরসভায় বদলি করার সরকারি আদেশ জারি করলেও সেই আদেশ অমান্য করে তিনি এখনও হাটহাজারীতেই দায়িত্ব পালন করছেন।

নিয়ম অনুযায়ী বদলির পরে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ফয়সল খান সেই নিয়ম মানছেন না। ফলে এই ঘটনাকে ঘিরে জন্ম নিয়েছে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক ও সমালোচনা।

স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ ও পৌরসভা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এই ঘটনাকে ‘একজন কর্মকর্তার অবাধ প্রভাব ও সিন্ডিকেটের শক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।

বহু বছর ধরে হাটহাজারীতে দায়িত্ব পালনকারী এই প্রকৌশলীকে ঘিরে আগে থেকেই দুর্নীতির নানা অভিযোগ রয়েছে।

তার বিরুদ্ধে প্রকল্প টেন্ডার, বিল-ভাউচার, নির্মাণ সামগ্রী ক্রয়, রাস্তা-মেরামত, ড্রেনেজ সংস্কারসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে শোনা যায়। নতুন বদলির পরও আগের কর্মস্থলে থাকা—একটি নিয়মবহির্ভূত দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বদলি আদেশ, কিন্তু কর্মকর্তা বহাল—কীভাবে?
স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা আদেশে বলা হয়, উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ফয়সল আহমদ খানকে জনস্বার্থে রাউজান পৌরসভায় বদলি করা হয়েছে এবং সেই আদেশ কার্যকর হবে অবিলম্বে। একই সঙ্গে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে বলা হয়।

অথচ সে সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ফয়সল খান হাটহাজারীতে অবস্থান করছেন। পৌরসভা ভবনে নিয়মিত অফিস করছেন, প্রকল্প কাজ পরিচালনা করছেন, এমনকি নির্মাণকাজের তদারকিসহ বিভিন্ন অফিসিয়াল কার্যক্রমে আগের মতোই সক্রিয় আছেন।

অভিযোগ উঠেছে—নির্দেশ অমান্য করা সত্ত্বেও কেন তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না?

অভিযোগ: মোটা অঙ্কের টাকায় ‘অবৈধ চুক্তি’
স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও পৌরসভার একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বদলির পরও ফয়সল খান হাটহাজারীতে বহাল থাকার পেছনে রয়েছে একটি ‘অবৈধ আর্থিক সমঝোতা’।

অভিযোগ অনুযায়ী, মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে চুক্তি করে তিনি থাকছেন, আর সেই চক্র তাকে রক্ষা করছে।

তাদের দাবি—এটি কেবল একজন ব্যক্তির অবস্থান নয়; বরং কয়েকজন কর্মকর্তা, কিছু পৌরসভা কর্মচারী, ঠিকাদার এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের অংশ। এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্পের বাজেট থেকে অনিয়মিত সুবিধা গ্রহণ করে আসছে।

একজন প্রবীণ পৌর কর্মকর্তা বলেন—“বদলির পরও একজন কর্মকর্তা থেকে গেলে বুঝতে হবে, এর পেছনে কারও স্বার্থ রয়েছে। নিয়ম ভাঙা এমন ঘটনা হুট করে ঘটে না।”

অভিযোগের বিষয়ে কী বললেন পরিচালক?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক মনোয়ারা বেগম বলেন,“তার কিছু অফিসিয়াল কাজ বাকি আছে সেগুলো শেষ হলেই তিনি চলে যাবেন।”

তবে তিনি অবৈধ চুক্তি বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তার মতে, বিষয়টিকে কেউ কেউ অতিরঞ্জিত করে প্রচার করছে।

তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ৭ কর্মদিবসের নিয়মটি খুব কঠোরভাবে পালন করা হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে নিয়ম প্রয়োগে অদৃশ্য কোনো বাধা রয়েছে বলেই তাদের সন্দেহ।

একজন নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন,নিয়ম সবার জন্য সমান। একজন বদলি হওয়া কর্মকর্তা যদি সপ্তাহের পর সপ্তাহ অফিসে বসে থাকেন, এটি স্পষ্টভাবেই নীতিমালা লঙ্ঘন।

হাটহাজারী পৌরসভায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম—এই বদলি কি তার ফলাফল?

হাটহাজারী পৌরসভায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ আছে:

রাস্তা নির্মাণে নিম্নমানের ইট ও বালু ব্যবহার, ড্রেন নির্মাণে দুর্বল কাঠামো, প্রকল্প অনুমোদনে অস্বচ্ছতা, ঠিকাদার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, বিল-ভাউচার যাচাইয়ে অনিয়ম, অনুমোদনহীন ও অতিরিক্ত বিল উত্তোলন।

এই অভিযোগগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে ফয়সল খাঁনের নাম বারবার এসেছে। যদিও তিনি সবসময় অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তবে স্থানীয়দের দাবি, নতুন মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু অনিয়ম চোখে পড়ায় প্রশাসন বদলির পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু বদলির পরও ফয়সলের বহাল থাকা এই অভিযোগগুলোকে আরও শক্তিশালী করছে।

প্রশ্ন উঠছে—প্রশাসনিক শৃঙ্খলা কোথায়?
নিয়ম ভঙ্গ করে আগের কর্মস্থলে থাকার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। নাগরিক সমাজের প্রশ্ন—একজন বদলি হওয়া কর্মকর্তা কীভাবে পুরোনো অফিসে কাজ চালিয়ে যান?

স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশ কি শুধু কাগজে-কলমে?

যদি সাধারণ কর্মচারীরা বদলির নিয়ম মানতে বাধ্য হয়, তবে একজন প্রকৌশলী কেন ছাড় পাবেন?

প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে তার যোগসাজশ কি প্রশাসন জানে না?

কর্মকর্তাদের মুখে গোপন ক্ষোভ:
পৌরসভার ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, অনেক কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা বলতে চান না। তবে ব্যক্তিগতভাবে তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা মনে করেন, ফয়সলের বহাল থাকা দেখে অন্যান্য কর্মচারীরাও নিয়মকে গুরুত্ব দেবে না। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নষ্ট হবে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা বাড়বে।
নতুন প্রকৌশলী যোগ দিতে পারছেন না, ফলে কাজ আটকে যাচ্ছে।

একজন কর্মকর্তা বলেন, যিনি বদলি হয়েছেন, তিনি কাজের দায়িত্বে থাকলে নতুন কর্মকর্তা কীভাবে কাজ বুঝবেন? পুরো ব্যবস্থাপনা অচল হয়ে যায়।

জনমনে ক্ষোভ—স্থানীয়দের দাবি তদন্তের:

স্থানীয় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি, সাংবাদিক, শিক্ষক—সবাই এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা টিকে থাকে নিয়ম-নীতি মানার ওপর।

একজন বদলি হওয়া কর্মকর্তা যদি পুরোনো জায়গায় বসে অফিস চালায়, তাহলে এই ব্যবস্থার নাম কী? তারা দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

আইনি অবস্থান কী বলে?
স্থানীয় সরকার বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী,বদলির আদেশ পাওয়ার পর কর্মকর্তা সর্বোচ্চ ৭ কর্মদিবস আগের কর্মস্থলে থাকতে পারবেন।
তার বেশি সময় থাকা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। এ ক্ষেত্রে বিভাগ চাইলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। অতিরিক্ত সময় অবস্থান করা দায়িত্ব অবহেলা এবং নিয়ম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা সাধারণত ঘটে না। হয় কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ, নয়তো গোপনে কোনো প্রভাব কাজ করছে।

ফয়সাল খাঁনের বিরুদ্ধে অতীত অভিযোগ, যা নতুন করে আলোচনায়:
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে ফয়সল খানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ ওঠে—মাটি ভরাটে ঘুষ গ্রহণ, উপকরণ সরবরাহে সুবিধা গ্রহণ, ড্রেন নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, দোকান-ঘর নির্মাণে অনুমোদন দিতে টাকা দাবি, বিল উত্তোলনে অতিরিক্ত অংশ নেওয়ার অভিযোগ, টেন্ডারে ইচ্ছাকৃতভাবে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া। যদিও এসব অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়নি।

বদলি—কিন্তু চলে নি কেন? সম্ভাব্য তিনটি কারণ

১️. অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
এটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। অভিযোগ অনুযায়ী, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে প্রভাবশালী চক্র তাকে রক্ষা করছে।

২️. প্রভাবশালী রাজনৈতিক আশ্রয়
কেউ কেউ বলছেন, তিনি কিছু রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়ে আছেন। ফলে কেউ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছেন না।

৩️. প্রকল্প স্বার্থ
চলমান কয়েকটি প্রকল্পে বড় অঙ্কের টাকা রয়েছে। নতুন কর্মকর্তা এলে অস্বচ্ছতা ধরা পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও অনেকের।

অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’
কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ফয়সলের বিরুদ্ধে কথা বললে বদলি বা হয়রানির শিকার হতে হয়। এই অভিযোগ স্থানীয় প্রশাসনে এক ধরনের ভয় ও নীরবতা তৈরির ইঙ্গিত দেয়।

জনগণের রোষ; ফয়সলকে অপসারণের দাবি জোরালো :
হাটহাজারী বাজার, আমানবাজার, মির্জাপুর, বড়দিঘীর পাড়, মানিকসহ বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষ বলছেন, পৌরসভার উন্নয়ন কাজের মান খুব খারাপ, একই জায়গায় বারবার রাস্তায় গর্ত, ড্রেন নির্মাণের পরও পানি জমে থাকে, মাটি ভরাটে অনিয়ম, দোকান নির্মাণে ঘুষের অভিযোগ। এই সব অভিযোগ অনেকেই ফয়সল খানকে ঘিরে তুলছেন।

একজন ব্যবসায়ী বলেন, তিনি না গেলে পৌরসভার কোনো কাজ ঠিকমতো হবে না। আগে তাকে সরাতে হবে।

এই ঘটনার প্রভাব ; যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করবে :
প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে, দুর্নীতি বৃদ্ধি পাবে, নাগরিক সেবা ব্যাহত হবে, প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বচ্ছতা থাকবে, নতুন কর্মকর্তারা কাজ বুঝতে পারবেন না, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি বাড়বে।

জোড়ালো হয়েছে দ্রুত তদন্তের দাবি :
হাটহাজারী পৌরসভায় বদলির পরও দায়িত্বে থাকা ফয়সল আহমদ খানের ঘটনা এখন প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা; সবার কাছে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নাগরিক সমাজ বলছে, এটি শুধু একজন কর্মকর্তার বিষয় নয়; এটি পুরো প্রশাসনের নৈতিকতার প্রশ্ন। তাই তারা দাবি করেছেন, বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে তদন্ত করা, বদলির আদেশ দ্রুত কার্যকর করা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন, প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং পৌরসভায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।