শক্তি, শিকড় ও উৎসবের নাম লালদীঘি: ১১৭ বছরে আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ২:১২ অপরাহ্ন /
শক্তি, শিকড় ও উৎসবের নাম লালদীঘি: ১১৭ বছরে আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা

চট্টগ্রামের হৃদয়ে, ঐতিহাসিক লালদীঘির পাড়ে, প্রতি বৈশাখে জেগে ওঠে এক অনন্য আবেগ। এটি শুধু একটি খেলা নয়, শুধু একটি মেলাও নয়—এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রতিরোধ, সংস্কৃতি এবং মানুষের মিলনমেলার এক জীবন্ত প্রতীক।

আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা এবং তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বৈশাখী মেলা আজ চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবার এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন পা দিয়েছে ১১৭ বছরে।

ইতিহাসের উত্তাল প্রেক্ষাপটে এক অনন্য সূচনা:
১৯০৯ সাল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে উপমহাদেশজুড়ে ক্ষোভ, বিক্ষোভ এবং প্রতিরোধের সুর ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। চারদিকে শোষণ, বঞ্চনা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণদের সংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ঠিক সেই সময় বদরপাতির প্রখ্যাত ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর বেছে নেন এক অভিনব পথ।

তিনি বুঝেছিলেন, জাতিকে জাগাতে হলে আগে জাগাতে হবে তরুণদের মন ও শরীর। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় বলীখেলা। মল্লযুদ্ধের মাধ্যমে তরুণদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং লড়াইয়ের মানসিকতা গড়ে তোলাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। বাইরে থেকে এটি ছিল বিনোদন, কিন্তু ভেতরে ছিল প্রতিরোধের প্রস্তুতি।

প্রতিরোধের মঞ্চ থেকে জনউৎসব:
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই বলীখেলা কেবল ক্রীড়া আয়োজন ছিল না; এটি ছিল স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত করার এক কার্যকর মাধ্যম। বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের গ্রন্থে অনুশীলন সমিতির কার্যক্রমে যে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির কথা উল্লেখ আছে, বলীখেলা তারই এক জনমুখী প্রতিফলন।

লাঠিখেলা, কুস্তি, মুষ্টিযুদ্ধ—এসবের মাধ্যমে তরুণদের তৈরি করা হতো সংগ্রামের জন্য। চট্টগ্রামেও সেই চেতনার বিস্তার ঘটায় বলীখেলা। ধীরে ধীরে এটি শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র থেকে রূপ নেয় জনমানুষের প্রাণের উৎসবে।

বলীখেলাকে ঘিরে বৈশাখী মেলার বিস্তার :
আবদুল জব্বারের বলীখেলাকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় বৈশাখী মেলা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মেলা হয়ে ওঠে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ লোকজ আয়োজন। আজ এটি শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এটি এক সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক মিলনমেলা।

আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের সামনে থেকে লালদীঘি মোড়, কে সি দে রোড, সিনেমা প্যালেস মোড় হয়ে কোতোয়ালি মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত এই মেলায় সৃষ্টি হয় এক বিশাল জনসমুদ্র। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি দোকান, মাঝখানে মানুষের ঢল—যেন শহরের প্রাণ এসে মিশেছে এই এক বিন্দুতে।

মেলায় লোকজ ঐতিহ্যের রঙিন সমারোহ :
মেলায় পাওয়া যায় ঘরের প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্য। খাট-পালং, ঝাড়ু, থালাবাসন, দা, বঁটি, ছুরি, আয়না থেকে শুরু করে শিশুদের খেলনা, রঙিন পুতুল, দোলনা—সবই রয়েছে বিশাল পসরা জুড়ে।

কে সি দে রোডজুড়ে মাটির ফুলদানি, টব, শোপিস, রঙিন পুতুল, বাঁশ ও বেতের ঝুড়ি, চেয়ার, ছোট তাক এবং দেয়ালসজ্জার সামগ্রী যেন মেলায় এনে দেয় গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্পর্শ। এখানে প্রয়োজনের সঙ্গে মিশে থাকে সৌন্দর্য, আর ব্যবহারিকতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ।

সুর, রং আর মানুষের গল্প :
আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের সামনে বসে একতারা, দোতারা ও ডুগডুগি নিয়ে সুর তুলছিলেন কুষ্টিয়ার লালনের আখড়ার পাশের মানুষ মোহাম্মদ সাজু। প্রায় এক দশক ধরে দেশের বিভিন্ন মেলায় ঘুরে বেড়ানো এই শিল্পী টানা আট বছর ধরে আসছেন চট্টগ্রামের এই মেলায়। তাঁর কথায়, এখানে শুধু ব্যবসা নয়, মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ তৈরি হয়।

অন্যদিকে, হাজারি গলিতে বাঁশির সুরে ক্রেতাদের টানছিলেন রাজশাহীর গগন মণ্ডল। চার দশকের অভিজ্ঞ এই বিক্রেতার সামনে সাজানো ছিল নানা আকারের বাঁশি। তাঁর সুরে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই থমকে দাঁড়াচ্ছিলেন।

জীবিকার বড় উৎস :
চন্দনাইশ থেকে আসা আবদুল মান্নান প্রায় ৩০ বছর ধরে এই মেলায় ঝাড়ু বিক্রি করছেন। তাঁর মতো হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে এই মেলা বছরের অন্যতম বড় আয়ের সুযোগ। কারও জন্য এটি ব্যবসা, কারও জন্য জীবিকা, কারও জন্য বছরের সেরা উৎসব।

হাটহাজারী থেকে আসা খাবার বিক্রেতা মো. রাজ্জাকও প্রতিবছর এই মেলায় অংশ নেন। মণ্ডা, মিঠাই, চানাচুর, টফি, আচার—তাঁর দোকানের সামনে ছোটদের ভিড়ই বলে দেয়, এই মেলা আনন্দেরও আরেক নাম।

শিশুদের জন্য এক রঙিন জগৎ :
রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা, বাঁশের গাড়ি, ঘুড়ি, ছোট পুতুল, দোলনা, আলো জ্বলা গাড়ি, শব্দ করা খেলনা—শিশুদের জন্য মেলায় যেন তৈরি হয় স্বপ্নের এক আলাদা রাজ্য। এসব দোকানের সামনে সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকে ছোটদের। আর তাদের হাসিমুখই মেলার প্রাণকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।

বলীদের মহারণ: আজ লড়বেন ১০৮ জন:
আজ শনিবার বেলা তিনটায় ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে রিংয়ে নামবেন ১০৮ জন বলী। সবার লক্ষ্য একটাই—শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জয়।

গত বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন কুমিল্লার মো. শরীফ, যিনি বাঘা শরীফ নামে পরিচিত। এবারও তিনি অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি থাকছেন গতবারের রানার্সআপ মো. রাশেদ, অর্থাৎ রাশেদ বলী। তাঁদের অংশগ্রহণকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি উচ্ছ্বাস।

সময়ের পরীক্ষায় অমলিন :
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একবার এবং সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস মহামারির কারণে টানা দুই বছর এই আয়োজন বন্ধ ছিল। তবুও প্রতিবারই নতুন উদ্যমে ফিরে এসেছে বলীখেলা। কারণ, এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়—এটি চট্টগ্রামের আত্মপরিচয়ের অংশ।

শিকড়ের টানে, ইতিহাসের আহ্বানে:
সময়ের সঙ্গে শহর বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, উৎসবের ধরনও পাল্টেছে। কিন্তু লালদীঘির মাটিতে বলীদের লড়াই দেখার আকর্ষণ একটুও কমেনি। কারণ এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রতিরোধ, সংস্কৃতি এবং মানুষের আবেগ।

লালদীঘির বৈশাখী মেলা তাই শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এটি স্মৃতির ভাণ্ডার, সংস্কৃতির প্রদর্শনী, লোকজ ঐতিহ্যের মহাসম্মেলন এবং চট্টগ্রামের প্রাণের স্পন্দন।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আবদুল জব্বারের বলীখেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শক্তি শুধু শরীরে নয়, ঐতিহ্য ধরে রাখার মনেও থাকে। আর সেই শক্তিরই জীবন্ত প্রতীক চট্টগ্রামের লালদীঘি।