
বাংলাদেশের অভিনয় অঙ্গনের এক পরিচিত, প্রিয় এবং আপন মুখ তারিকুজ্জামান তপন আর নেই।
গতকাল শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে রাজধানীর আফতাবনগরে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর।
দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শেষে তিনি পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে। তাঁর এই বিদায়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সমগ্র সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।
একজন শিল্পীর মৃত্যু কেবল একটি জীবনের অবসান নয়; এটি একটি সময়ের, একটি অনুভূতির, একটি পরিচিত উপস্থিতির বিদায়।
তারিকুজ্জামান তপন ছিলেন ঠিক তেমনই এক শিল্পী—যিনি পর্দায় উপস্থিত হলেই দর্শকের মনে জন্ম নিত এক অদ্ভুত স্বস্তি, এক অনাবিল আপনত্ব।
তাঁর অভিনয় ছিল সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত, হৃদয়ছোঁয়া। বিশেষ করে কৌতুক চরিত্রে তাঁর সাবলীলতা তাঁকে এনে দিয়েছিল দর্শকের অকৃত্রিম ভালোবাসা।
দীর্ঘদিন ধরে মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছিলেন এই গুণী অভিনেতা। গত ডিসেম্বর মাসে তাঁর খাদ্যনালিতে ক্যানসার ধরা পড়ে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, রোগটি ইতোমধ্যেই চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এরপর শুরু হয় জীবন বাঁচানোর কঠিন সংগ্রাম।
তিন দফা কেমোথেরাপিও সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মৃত্যু তাঁকে আপন করে নেয়।
শেষ কয়েকদিনে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তাঁকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।
পরিবার, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী—সবার প্রার্থনা ছিল, তিনি আবারও ফিরে আসবেন, আবারও হাসাবেন, আবারও পর্দায় দেখা দেবেন।
কিন্তু চিকিৎসকেরা যখন জানিয়ে দিলেন, আর কিছু করার নেই, তখন তাঁকে বাসায় নিয়ে আসা হয়। আর সেখানেই, আপনজনদের সান্নিধ্যে, তিনি চিরবিদায় নিলেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন স্নেহশীল স্বামী, দায়িত্ববান পিতা এবং পরিবারের অবলম্বন। রেখে গেছেন স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং এক ছেলে। তাঁর শূন্যতা শুধু পরিবারেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সহকর্মী, বন্ধু এবং অসংখ্য ভক্তের হৃদয়ে।
অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুনুর রহমান অপু তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
অভিনয়শিল্পী সংঘ এক শোকবার্তায় জানিয়েছে, “সংগঠনের সম্মানিত সদস্য ও আমাদের প্রিয় সহকর্মী তারিকুজ্জামান তপন না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।”
ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দা—দুই অঙ্গনেই তাঁর বিচরণ ছিল সমান উজ্জ্বল। টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি রেখে গেছেন এক অনন্য স্বাক্ষর।
তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলতা বানু, ঠিকানা এবং যা ছিল অন্ধকারে। আর নাটকে তিনি দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন জোড়া শালিক, হাতছানি, অল্পে গল্পে এবং মৃত্তিকার যাত্রা-র মতো অসংখ্য সৃষ্টিতে।
তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল স্বাভাবিকতা। তিনি চরিত্র হয়ে উঠতে জানতেন, চরিত্রকে নিজের ভেতর ধারণ করতে জানতেন। তাই তাঁর সংলাপ, তাঁর অভিব্যক্তি, তাঁর উপস্থিতি—সবই দর্শকের হৃদয়ে গেঁথে থাকত দীর্ঘকাল।
আজ তিনি নেই। কিন্তু শিল্পী কি কখনও হারিয়ে যান? তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের সৃষ্টিতে, তাঁদের কাজের ভেতর, দর্শকের স্মৃতিতে।
তারিকুজ্জামান তপনও তেমনই বেঁচে থাকবেন—বাংলাদেশের নাটক ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে, সহকর্মীদের স্মৃতিতে, আর কোটি দর্শকের ভালোবাসায়।
শুক্রবার রাতেই আফতাবনগরের পরশিনগর জামে মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাঁর মরদেহ নেওয়া হবে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলায়। সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
একটি প্রিয় মুখ হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তারিকুজ্জামান তপনের প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন কত ক্ষণস্থায়ী, অথচ শিল্প কত অনন্ত।
বিদায়, প্রিয় অভিনেতা। আপনার হাসি, আপনার অভিনয়, আপনার অনন্য উপস্থিতি আমাদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে।






















আপনার মতামত লিখুন :