
চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দান যেন প্রতি বছরই একদিনের জন্য ফিরে যায় তার শিকড়ে। ঢোলের তালে, দর্শকের উচ্ছ্বাসে আর বৈশাখী মেলার রঙিন আমেজে প্রাণ ফিরে পায় শতবর্ষী এই প্রাঙ্গণ।
সেই উৎসবমুখর পরিবেশেই এবার অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলার ১১৭তম আসর। আর এই আসরের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজনই—কুমিল্লার বাঘা শরীফ।
শনিবার বিকেলে লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত ফাইনালে রাশেদ বলীকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছেন বাঘা শরীফ। এর মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো জব্বারের বলীখেলার চ্যাম্পিয়ন হলেন তিনি।
এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে এমন ধারাবাহিক আধিপত্য খুব কমই দেখা গেছে।
ফাইনাল লড়াই ছিল রোমাঞ্চে ভরপুর। গত দুই আসরের মতো এবারও শিরোপা নির্ধারণী মঞ্চে মুখোমুখি হন বাঘা শরীফ ও রাশেদ। শুরু থেকেই দুই বলী ছিলেন সমান তেজি।
শক্তি, কৌশল আর ধৈর্যের লড়াইয়ে মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। দর্শকের চোখ ছিল মঞ্চের প্রতিটি মুহূর্তে।
টানটান উত্তেজনার ২৪ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের লড়াই শেষে রাশেদকে পরাজিত করে বিজয়ের হাসি হাসেন বাঘা শরীফ।
ফাইনালে ওঠার পথও ছিল নাটকীয়। প্রথম সেমিফাইনালে মিঠুকে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করেন রাশেদ। অন্য সেমিফাইনালে বাঘা শরীফের প্রতিপক্ষ ছিলেন শাহ জালাল।
সেই লড়াই সমঝোতার ভিত্তিতে শেষ হলে বাঘা শরীফকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ফলে টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে মুখোমুখি হন বাঘা শরীফ ও রাশেদ—যা এবারের আসরে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করে।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াইয়ে জয় পান মিঠু। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ১০৮ জন বলীর অংশগ্রহণে এবারের আসর ছিল প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও জমজমাট। প্রতিটি লড়াইয়ে দর্শকের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
বাঘা শরীফের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ঘারমোড়া ইউনিয়নের মণিপুর গ্রামে।
অন্যদিকে রানারআপ রাশেদ বলীর বাড়ি কুমিল্লা সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের নসরাইল গ্রামে। কুমিল্লার দুই বলীর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন জব্বারের বলীখেলার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
শুধু বলীখেলা নয়, লালদীঘি মাঠসংলগ্ন বৈশাখী মেলাও ছিল মানুষের মিলনমেলায় পরিণত। দিনভর কেনাকাটা, বাহারি পণ্যের পসরা, মুখরোচক খাবারের স্টল এবং নানা বিনোদনের আয়োজন ঘিরে সেখানে ছিল উপচে পড়া ভিড়। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা ছিল উৎসবের রঙে রাঙানো।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট ও পুরস্কার তুলে দিয়েছেন অতিথিরা। বিজয়ী বাঘা শরীফের হাতে ক্রেস্ট ও সম্মাননা চেক তুলে দেন চট্টগ্রাম ৯ কোতোয়ালী আসনের সাংসদ আবু সুফিয়ান। অন্যান্য বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনসহ অতিথি বৃন্দ। এবারের আসরের টাইটেল স্পন্সর ছিল বাংলালিংক।
লোকজ ক্রীড়া, ঐতিহ্য আর উৎসব—এই তিনের অপূর্ব মেলবন্ধন জব্বারের বলীখেলা। আর সেই ঐতিহ্যের মঞ্চে এবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখলেন বাঘা শরীফ।
লালদীঘির লাল মাটিতে তাঁর এই জয় এখন শুধু আরেকটি শিরোপা নয়; এটি একচ্ছত্র আধিপত্যের, অধ্যবসায়ের এবং কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্প।






















আপনার মতামত লিখুন :