কুমিল্লা-১১ এ মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ, তৃণমূলে ক্ষোভ


Csp Admin প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৭, ২০২৫, ৯:৫০ পূর্বাহ্ন /
কুমিল্লা-১১ এ মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ, তৃণমূলে ক্ষোভ

বিএনপি প্রার্থী কামরুল হুদার বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝড়

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এমন প্রার্থী ঘোষণা করেছে,যিনি এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসা চৌদ্দগ্রাম আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছেন নবীন প্রার্থী কামরুল হুদাকে।

বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা যায়, কামরুল হুদা কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি।

স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে এই মনোনয়নকে ঘিরে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। যেখানে অন্যান্য সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিরা নির্বাচনী কৌশল সাজাচ্ছেন, সেখানে শক্তিশালী দলে দুর্বল প্রাথীর মনোনয়নে স্থানীয় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

তাছাড়া বিএনপির মনোনীত নয়া প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলীয় অবস্থান, নেতৃত্বে অনুপ্রবেশ এবং ব্যবসায়িক অনিয়ম–সংক্রান্ত নানা অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী।

তৃণমূলে প্রতিক্রিয়া:
একজন স্থানীয় সিনিয়র বিএনপি নেতা বলেন, “যারা আন্দোলনে ছিল, তারা বাদ পড়ছে; অথচ আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠরা নেতৃত্বে আসছেন। এটা আমাদের জন্য হতাশার।”

আরেক তরুণ নেতা বলেন, “দলীয় নেতৃত্বে টাকার প্রভাব বাড়ছে, ফলে মাঠের কর্মীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।”

দলের অভ্যন্তরে এমন অসন্তোষ চলতে থাকলে তৃণমূল সংগঠন আরও দুর্বল হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, এই আসনে জামায়াতের প্রভাব বরাবরই দৃশ্যমান। সেখানে বিএনপির নবীন ও দুর্বল প্রার্থীর পক্ষে জয় পাওয়া সহজ হবে না।

আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগ :
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও দলীয় নেতাদের একাংশের অভিযোগ, ২০০৬ সাল থেকে কামরুল হুদা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রহমত উল্লাহ বাবুল এবং সহ সভাপতি মো. আলী আসওয়াবের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব রয়েছেন। এই সম্পর্কের কারণে স্থানীয়ভাবে অনেকে তাঁকে “আওয়ামী লীগের বি–টিম” বলে উল্লেখ করছেন।

বিতর্কিত নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ :
নবগঠিত উপজেলা বিএনপি কমিটিতে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে বিপুল টাকার বিনিময়ে পদ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ করেছেন তৃণমূলের নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, আন্দোলনে সক্রিয় থাকা নেতাদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ও অর্থশালী ব্যক্তিরা নেতৃত্বে জায়গা পাচ্ছেন।

উদাহরণ হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী লীগ–মনোনীত সাবেক চেয়ারম্যান পাশার ছেলে এবং একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আবিরকে ছাত্রদলের নবনিযুক্ত সেক্রেটারি করা হয়েছে। একইভাবে যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাবুদ্দিন লালটু ও রিয়াজ উদ্দিনকেও আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ হিসেবে অভিযোগ করা হয়েছে।

ভাইরাল ছবি নিয়ে বিতর্ক :
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় কামরুল হুদা বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার মামলার আসামি ওলামা লীগ নেতা হাবিবুর রহমান কাচপুরীর সঙ্গে একই গাড়িতে ভ্রমণ করছেন।কুমিল্লা-১১, কামরুল হুদা, মনোনয়ন, বিএনপি

এই ঘটনার পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। এছাড়া সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের সঙ্গে বৈঠকেরও একটি ছবি স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।কুমিল্লা-১১, কামরুল হুদা, মনোনয়ন, বিএনপি

ব্যবসায়িক অনিয়মের অভিযোগ:
কামরুল হুদার অংশীদারিত্ব থাকা মিয়া বাজার সিএনজি ফিলিং স্টেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে গ্যাস মিটার টেম্পারিংসহ চারটি ঘটনায় প্রায় ১১ কোটি ৮৩ লাখ টাকার আর্থিক দায় নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড।

কামরুল হুদা
কামরুল হুদার অংশীদারিত্ব থাকা মিয়া বাজার সিএনজি ফিলিং স্টেশন লি. বাকীরা আ.লীগ নেতা

প্রতিষ্ঠানটির সংযোগ বর্তমানে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে হাইকোর্ট ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) একাধিক মামলা চলছে।

কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জানানোর ইঙ্গিত :
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতা জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব উপজেলা কমিটি ও মনোনয়ন পুনর্বিবেচনা করবে বলে বিশ্বাস করি।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানার জন্য বহুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন প্রতিবেদক। চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি কামরুল হুদা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করায় এসব অভিযোগের সত্যতা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা যায়নি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য :
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের নির্বাচন ছাড়া কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে বিএনপি আর কখনও বিজয়ী হতে পারেনি। এ আসনে বিএনপি একবার এবং জামায়াতে ইসলামী একবার বিজয়ী হয়েছিল।

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী একেএম কামরুজ্জামান এ আসনে জয়লাভ করেন। তিনি মোট ৪০.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এই দলটির মনোনীত প্রার্থী অংশ নিলেও ৩৬.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। এরপর এই আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী দেয়নি। ২০০১ সাল থেকে জোটের শরিক জামায়াতকে এ আসনটি ছেড়ে দেয়।

২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। ওই বছর তিনি মোট ৬৪.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে জোট সমর্থিত জামায়াত থেকে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ৪০.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। সর্বশেষ সংসদে এ আসনটি ছিল আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুল হক মুজিবের দখলে।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় বিএনপি সুবিধা পাবে বলে ধারণা করেছেন অনেকেই। তবে জামায়াতেরও ঐতিহাসিক ভোটব্যাংক রয়েছে এ আসনে।