গৃহকর নিয়ে চসিক-বন্দর দ্বন্দ্ব: ৪৫ কোটি থেকে ২৬৪ কোটির বিস্ফোরণ


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : মে ২১, ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন /
গৃহকর নিয়ে চসিক-বন্দর দ্বন্দ্ব: ৪৫ কোটি থেকে ২৬৪ কোটির বিস্ফোরণ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে বহুদিনের গৃহকর বিরোধ নতুন মোড় নিয়েছে। আপিল শুনানি শেষে চসিক বন্দরের বার্ষিক গৃহকর ২৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছে।

এর আগে বন্দর কর্তৃপক্ষ বছরে ৪৫ কোটি টাকা করে গৃহকর দিয়ে আসছিল। নতুন এই নির্ধারণের ফলে এক ধাক্কায় প্রায় ২২০ কোটি টাকা বেড়ে গেল করের পরিমাণ।

গত ৩ মে চসিকে অনুষ্ঠিত আপিল শুনানিতে মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ দুই সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। শুনানি শেষে পরদিন ৪ মে বন্দর কর্তৃপক্ষকে নতুন কর পরিশোধের নোটিশ পাঠানো হয়।

‘রাস্তা ভাঙে বন্দরের গাড়ি, করও দেয় না’:
বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ জানিয়েছেন চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেন। সম্প্রতি নগরের একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম নগরের অধিকাংশ সড়কের ধারণক্ষমতা ১০ টন হলেও বন্দরের ৪০ থেকে ৫০ টনের ভারী যানবাহন নিয়মিত চলাচল করছে। এতে নগরের সড়ক ও সেতুর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

মেয়রের ভাষ্য, চসিক ক্ষতিপূরণ দাবি করছে না; বরং আইন অনুযায়ী যে গৃহকর পাওনা, সেটিই আদায় করতে চায়। তাঁর অভিযোগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই ন্যায্য পাওনাও পরিশোধে গড়িমসি করছে।

১ কোটি ৭৩ লাখ বর্গফুট স্থাপনার হিসাব :
চসিক সূত্র বলছে, বিরোধ নিরসনে গত বছরের ১৪ আগস্ট আট সদস্যের একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির জরিপে বন্দরের স্থাপনার আয়তন ধরা হয় ১ কোটি ৭৩ লাখ বর্গফুট। সেই হিসাব অনুযায়ী গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

বন্দর কর্তৃপক্ষ স্থাপনার আয়তনের বিষয়ে একমত হলেও কর নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলেছে।

বন্দরের দাবি: কর হওয়া উচিত ১৪ কোটি ৮৭ লাখ :
চসিকের নির্ধারণকে চ্যালেঞ্জ করে গত ২৮ এপ্রিল আপিল করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আপিলে তারা দাবি করে, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (ট্যাক্সেশন) রুলস, ১৯৮৬ অনুযায়ী সঠিকভাবে কর নির্ধারণ করা হয়নি।

বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, যৌথ জরিপ অনুযায়ী তাদের গৃহকর হওয়া উচিত ১৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। অথচ বর্তমানে তারা ৪৫ কোটি টাকা দিচ্ছে, যা প্রকৃত করের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি।

তাদের আরও দাবি, পাঁচ বছর অন্তর গৃহকর পুনর্মূল্যায়নের বিধান রয়েছে। সে হিসাবে নতুন কর কার্যকর হতে পারে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে, এখন নয়।

১৬০ কোটি থেকে ৪৫ কোটিতে নামানো হয়েছিল:
চসিক সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পঞ্চবার্ষিক পুনর্মূল্যায়নে বন্দরের গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১৬০ কোটি টাকা।

তবে বন্দরের আপত্তির মুখে সাবেক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর সময়ে সমঝোতার ভিত্তিতে তা কমিয়ে ৪৫ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু গত বছরের ৩ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর মেয়র শাহাদাত হোসেন আবারও ১৬০ কোটি টাকা হারে কর আদায়ে উদ্যোগ নেন। পরে যৌথ জরিপ ও নতুন হিসাবের ভিত্তিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬৪ কোটির বেশি।

নৌ মন্ত্রণালয়ের চিঠিও মানছে না বন্দর?
গৃহকর পরিশোধ বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে গত ১৩ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জবাবে ২২ এপ্রিল মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (ট্যাক্সেশন) রুলস, ১৯৮৬ অনুযায়ী কর নির্ধারণের এখতিয়ার চসিকের।

চিঠিতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চসিক নির্ধারিত কর পরিশোধ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

এরপরও কর পরিশোধে কার্যত অনীহা দেখাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকেই তারা গৃহকর দেওয়া বন্ধ রেখেছে বলে জানা গেছে।

সামনে আইনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত:
চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল জানিয়েছেন, আপিল শুনানিতে বন্দরের পক্ষ থেকে পুনর্মূল্যায়নের দাবি তোলা হলেও বিধি অনুযায়ী সেই সুযোগ নেই।

তবে তারা চাইলে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আবারও আপিল করতে পারবে। সেক্ষেত্রে নির্ধারিত করের ৭৫ শতাংশ আগে জমা দিতে হবে।

অন্যদিকে বন্দরের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্বে) সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেছেন, তারা নতুন করের নোটিশ পেয়েছেন এবং বিষয়টি বিধি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

নগর বনাম বন্দর: দ্বন্দ্বের গভীরে অর্থনীতি ও ক্ষমতার প্রশ্ন:
চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভর করে দেশের আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ। অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগরের সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নগর অবকাঠামোর ওপর সবচেয়ে বেশি চাপও তৈরি হয় এই বন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রমে।

ফলে গৃহকর নিয়ে এই বিরোধ কেবল দুই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক টানাপোড়েন নয়; এটি নগর অবকাঠামোর ব্যয় বহন, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

এখন দেখার বিষয়—বন্দর কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত নতুন কর মেনে নেয়, নাকি বিষয়টি আরও দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক সংঘাতে গড়ায়।