
টাঙ্গুয়ার হাওর মানেই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ জলরাশি, আকাশভরা মেঘ আর ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনন্দঘন মুহূর্ত।
প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন কিছু নির্মল সময় কাটাতে, স্মৃতির খাতায় নতুন অধ্যায় যোগ করতে। কিন্তু শুক্রবারের সেই বিকেল টাঙ্গুয়ার হাওরের ইতিহাসে রেখে গেল এক গভীর বেদনার রেখা।
সেদিনও সবাই এসেছিলেন আনন্দ খুঁজতে। নতুন নির্মিত ‘ভ্রমণশৈলী’ হাউসবোটটির প্রথম যাত্রা ছিল সেটি। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন—সবার মুখে ছিল উচ্ছ্বাস।
হাওরের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ঘুরে দেখে তারা এগোচ্ছিলেন সীমান্তঘেঁষা নিলাদ্রী লেকের দিকে। চারপাশে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ গল্প করছিলেন, কেউবা হাওরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলেন দূরে।
সেই আনন্দময় পরিবেশেই ছিল আট বছরের সৌমাতা সরকার নিঝুম। বয়স মাত্র আট। পৃথিবীকে জানার, নতুন কিছু দেখার, বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকানোর সময় তার।
হয়তো সেও অন্য সবার মতো হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করছিল। হয়তো নিলাদ্রী লেক দেখার আগ্রহে ভরে ছিল তার ছোট্ট মন।
কিন্তু নিয়তি যেন ওত পেতে ছিল এক নিষ্ঠুর পরিণতির জন্য। বিকেল প্রায় তিনটার দিকে হাউসবোটটি যখন গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলছিল, তখন অসাবধানতাবশত বোটের পেছন থেকে সামনে যাওয়ার সময় চলন্ত ইঞ্জিনের ওপর পড়ে যায় নিঝুম।
মুহূর্তের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ বদলে যায় আতঙ্কে। চিৎকার, ছুটোছুটি, হাহাকার—সবকিছু ঘটে যায় কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে।
বোটে থাকা লোকজন সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন বন্ধ করেন। প্রাণপণ চেষ্টা চলে শিশুটিকে বাঁচানোর। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা ছিল আরও দ্রুত।
চলন্ত মেশিনের আঘাতে তার শরীর গুরুতরভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়। উদ্ধার করার আগেই নিভে যায় একটি কোমল প্রাণের আলো।
একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়। তার সঙ্গে মারা যায় অসংখ্য স্বপ্ন, অসংখ্য সম্ভাবনা, অসংখ্য আগামী দিনের গল্প।
নিঝুমের বাবা, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত উপপরিদর্শক (এসআই) স্বপন চন্দ্র সরকার, সেদিন পরিবারের সঙ্গে ছিলেন না। দায়িত্ব পালন করছিলেন কর্মস্থলে।
তার স্ত্রী ও দুই মেয়ে আত্মীয়ের হাউসবোটে করে ঘুরতে গিয়েছিলেন। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, মেয়েরা আনন্দ করে ফিরবে। হয়তো ফিরে এসে হাওরের গল্প শোনাবে। হয়তো ছোট্ট নিঝুম উচ্ছ্বাস নিয়ে বলবে—সে কী দেখেছে, কোথায় ঘুরেছে।
কিন্তু ভাগ্য তার জন্য অন্য সংবাদ লিখে রেখেছিল। একজন বাবার জীবনে সন্তানের মৃত্যু যে কত বড় বেদনা, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
স্বপন চন্দ্র সরকারের কণ্ঠে সেই অসহায় আর্তনাদই ফুটে উঠেছে—“আমার আদরের মেয়েটিকে হারালাম। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”
অন্যদিকে, ‘ভ্রমণশৈলী’ হাউসবোটের মালিক পংকজ রায়ের কাছেও দিনটি চিরকাল এক দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে।
যে নৌযানের প্রথম যাত্রা আনন্দ ও স্মৃতির উপলক্ষ হওয়ার কথা ছিল, সেটিই হয়ে গেল মৃত্যুর সাক্ষী। প্রথম ট্রিপের স্মৃতি হিসেবে যেখানে থাকার কথা ছিল হাসিমুখের ছবি, সেখানে রয়ে গেল কান্না, হাহাকার আর অনন্ত অনুশোচনা।
টাঙ্গুয়ার হাওরের জলরাশি আজও আগের মতোই ঢেউ তোলে। পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে আজও মানুষ ওঠে। নিলাদ্রী লেক আজও পর্যটকদের আহ্বান জানায়। কিন্তু একটি পরিবারের কাছে সেই হাওর আর কখনো আগের মতো থাকবে না।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার কামলাবাজ গ্রামের সেই বাড়িতে এখন হয়তো নিঝুমের খেলনা পড়ে আছে। হয়তো তার বইয়ের পাতায় এখনো অসমাপ্ত লেখা রয়ে গেছে।
হয়তো তার ব্যবহৃত ছোট্ট পোশাকগুলো আলমারিতে ঝুলছে। কিন্তু তাদের মালিক আর কোনোদিন ফিরে এসে সেগুলো স্পর্শ করবে না।
একটি আনন্দভ্রমণ শেষ হয়েছে গভীর শোকে। একটি বিকেল শেষ হয়েছে আজীবনের কান্নায়। আর টাঙ্গুয়ার হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশির মাঝে হারিয়ে গেছে ছোট্ট সৌমাতা সরকার নিঝুমের অসংখ্য না-বলা স্বপ্ন।
হাওরের বাতাস হয়তো আজও বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে সেই দিনের আর্তনাদ—এক শিশুর, এক মায়ের, এক বাবার, এক পরিবারের।
আর স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় যাত্রাও মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হতে পারে সবচেয়ে গভীর বেদনার গল্পে।






















আপনার মতামত লিখুন :