পেনাল্টি মিস থেকে ইতিহাসের চূড়ায়: মেসির জোড়া গোলে অস্ট্রিয়া-বধ, নকআউটে আর্জেন্টিনা


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : জুন ২৩, ২০২৬, ১২:০৫ অপরাহ্ন /
পেনাল্টি মিস থেকে ইতিহাসের চূড়ায়: মেসির জোড়া গোলে অস্ট্রিয়া-বধ, নকআউটে আর্জেন্টিনা

ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে যখন ম্যাচের মাত্র ৯ মিনিট, তখন হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি রাতটি শেষ পর্যন্ত লিওনেল মেসির আরেকটি মহাকাব্যিক অধ্যায়ে পরিণত হবে।

স্পট কিক নিতে এসে বল পোস্টের বাইরে পাঠিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। গ্যালারিজুড়ে নেমে এসেছিল এক মুহূর্তের স্তব্ধতা।

যে মুহূর্তে বিশ্বকাপ ইতিহাসের আরেকটি রেকর্ডের অপেক্ষায় ছিল হাজারো দর্শক, ঠিক সেই মুহূর্তেই দেখা মিলেছিল এক বিরল দৃশ্য—মেসির পেনাল্টি মিস।

কিন্তু মহান খেলোয়াড়দের পরিচয়ই হয়তো এখানেই। তারা ব্যর্থতাকে শেষ কথা হতে দেন না; বরং সেটিকেই নতুন গল্পের সূচনা বানান।

আর সেই গল্পের নাম—লিওনেল মেসি।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয়ে আর্জেন্টিনার নায়ক ছিলেন তিনি। দুটি গোল করেছেন, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসন নিজের করে নিয়েছেন, একই সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন আর্জেন্টিনার নকআউট পর্বে ওঠা।

৩৮ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে এমন পারফরম্যান্স শুধু পরিসংখ্যান নয়, ফুটবল ইতিহাসের জন্যও এক বিস্ময়কর বার্তা।

পেনাল্টি মিসের পর শুরু মেসির আসল গল্প :
ফুটবলে অনেক সময় একটি মুহূর্ত পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। চতুর্থ মিনিটে লওতারো মার্টিনেজকে ঘিরে বিতর্কিত পরিস্থিতি থেকে ভিএআরের সাহায্যে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। স্বাভাবিকভাবেই বলের পেছনে দাঁড়ান মেসি।

কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে তার শট পোস্টের ডান পাশ দিয়ে বাইরে চলে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন মিস মেসির ক্যারিয়ারে বিরল। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে। কিন্তু সেই ব্যর্থতাই যেন তাকে আরও ক্ষুধার্ত করে তোলে। এরপর ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনার প্রায় প্রতিটি আক্রমণের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি।

১৯ মিনিটে তার শট ঠেকান অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগার। আরও কয়েকটি আক্রমণে তাকে থামিয়ে দেয় অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগ।

কিন্তু প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ যতই শক্ত হোক, মেসির মতো শিল্পীকে পুরো ম্যাচ আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব।

যে গোল ইতিহাসের দরজা খুলে দিল :
৩৮তম মিনিটে আসে সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।

থিয়াগো আলমাদার পাস থেকে ফাকুন্দো মেদিনা নিচু ক্রস বাড়িয়ে দেন বক্সের প্রান্তে। সেখানে ছুটে আসা মেসি প্রথম স্পর্শেই এমন এক বাঁকানো শট নেন, যা গোলরক্ষকের নাগালের অনেক বাইরে গিয়ে জালে জড়ায়।

গোলটি ছিল কেবল স্কোরলাইন বদলানোর জন্য নয়। এটি ছিল ইতিহাস বদলানোর গোল।

এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৭-তে নিয়ে যান মেসি। ফলে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে বসেন তিনি।

গ্যালারির দর্শকরা তখন শুধু একটি গোল উদযাপন করছিলেন না; তারা প্রত্যক্ষ করছিলেন ইতিহাস রচনার মুহূর্ত।

কেন এখনও অনন্য মেসি?
ক্রীড়ামোদী বিশ্লেষকদের মতে, মেসির শ্রেষ্ঠত্ব শুধু গোলে নয়; খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতায়।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটিও ছিল তার প্রমাণ।

পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। কখনো গভীরে নেমে খেলা গড়েছেন, কখনো ডান প্রান্তে সরে গিয়ে জায়গা তৈরি করেছেন, আবার কখনো বক্সের সামনে এসে আক্রমণ শেষ করেছেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ৩৮ বছর বয়সেও তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি এবং খেলার পাঠ পড়ার ক্ষমতা যেন আগের চেয়েও পরিণত।

যেখানে অনেক ফুটবলার ক্যারিয়ারের শেষপ্রান্তে এসে গতি হারান, সেখানে মেসি অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে রূপান্তর করেছেন।

শেষ মুহূর্তে আরেকটি শিল্পকর্ম :
ম্যাচ তখন শেষের পথে। অস্ট্রিয়া মরিয়া হয়ে সমতা ফেরানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে আবারও হাজির হন মেসি।

দ্রুত পাল্টা আক্রমণে হুলিয়ান আলভারেজকে দারুণ একটি পাস দেন তিনি। প্রথম সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি আলভারেজ। তবে বল ফিরে আসে মেসির কাছেই।

এরপর যা হলো, সেটি ছিল এক মহাতারকার স্বাক্ষর। বক্সের ভেতরে ঢুকে প্রথম শট প্রতিহত হলেও ফিরতি প্রচেষ্টায় বল জড়িয়ে দেন জালে। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ২-০।

এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৮-তে উন্নীত করেন মেসি। ফলে ক্লোসের চেয়ে দুই গোল এগিয়ে গিয়ে আরও শক্তভাবে নিজের দখলে নেন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসন।

হ্যাটট্রিক না হলেও রাতটি ছিল মেসিরই:
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বিশ্বকাপে মাত্র দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করেছেন মেসি।

আরও একটি তথ্য হয়তো আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আক্ষেপ বাড়াবে—পেনাল্টি মিস না হলে কিংবা শেষ দিকে ফ্রি-কিকটি অল্পের জন্য বাইরে না গেলে হ্যাটট্রিকও হয়ে যেতে পারত।

কিন্তু হ্যাটট্রিক না হলেও এই রাতের গল্পে কোনো অপূর্ণতা নেই। কারণ এটি ছিল এমন একটি রাত, যেখানে একজন ফুটবলার আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা বলা হয়।

আর্জেন্টিনার জয়যাত্রার প্রাণভোমরা :

অস্ট্রিয়া সহজ প্রতিপক্ষ ছিল না। ইউরোপীয় দলটি পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার চোখে চোখ রেখে লড়েছে। কয়েকবার পাল্টা আক্রমণে বিপদও তৈরি করেছে।

তবে পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন একজন মানুষ। লিওনেল মেসি।

যখন ম্যাচ কঠিন হয়েছে, তখন তিনিই পথ দেখিয়েছেন। যখন গোল দরকার হয়েছে, তখন তিনিই গোল করেছেন। যখন ইতিহাস ডাক দিয়েছে, তখন তিনিই সাড়া দিয়েছেন।

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু খেলোয়াড় আছেন, যাদের উপস্থিতি একটি দলকে অন্য মাত্রা দেয়। বর্তমান আর্জেন্টিনার জন্য সেই নামটি নিঃসন্দেহে লিওনেল মেসি।

ডালাসের রাতটি তাই শুধু আর্জেন্টিনার একটি জয় নয়; এটি ছিল মেসির মহত্ত্বের আরেকটি স্মারক।

একটি পেনাল্টি মিস দিয়ে শুরু হওয়া রাত শেষ হয়েছে ইতিহাস, রেকর্ড, জোড়া গোল এবং নকআউট নিশ্চিত করার উল্লাসে।

আর বিশ্ব ফুটবল আবারও দেখেছে—বয়স ৩৮ হতে পারে, কিন্তু মেসির জাদুর বয়স হয় না।