ক্রিকেটার পরিচয়পত্র দেখিয়েও রক্ষা হয়নি, নাঈমকে পেটানোর অভিযোগে তোলপাড়!


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : জুন ১৩, ২০২৬, ৩:১৯ অপরাহ্ন / ০ Views
ক্রিকেটার পরিচয়পত্র দেখিয়েও রক্ষা হয়নি, নাঈমকে পেটানোর অভিযোগে তোলপাড়!

চট্টগ্রামের ব্যস্ত নগরজীবনে শুক্রবার রাতটি ছিল অন্যসব রাতের মতোই। বিমানবন্দর থেকে বাসার পথে ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অফস্পিনার নাঈম হাসান। ঢাকায় খেলা শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি।

কিন্তু লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছানোর পর কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিস্থিতি এমন মোড় নেয়, যা এখন দেশের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

নাঈম হাসানের অভিযোগ, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশা থামান। চালকের কাগজপত্র নেওয়ার পর হঠাৎ তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়।

তিনি নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেন, পরিচয়পত্রও দেখান। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, তাতেও পরিস্থিতি বদলায়নি।

বরং নাঈমের দাবি, খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম তাঁকে হাতে থাকা লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। একই সঙ্গে পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত সোহেল নামের এক ব্যক্তি পাইপ দিয়ে মারধরে অংশ নেন।

ঘটনাস্থলে শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করলেও হামলা থামেনি বলে অভিযোগ করেন এই ক্রিকেটার।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো, পুলিশের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও তাঁকে অন্য একটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

পরে তাঁকে খুলশী থানায় নেওয়া হয়। সেখানেও ওসির কক্ষে হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন নাঈম।

তদন্তে উঠে আসছে ‘ভুল তথ্যের’ সূত্র:
পুলিশ সূত্র বলছে, ছুটিতে থাকা খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম তথ্য দিয়েছিলেন একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সোনার চোরাচালান আসবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই এসআই শফিকুল ইসলাম অভিযান পরিচালনা করেন।

প্রশ্ন উঠেছে, একটি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাতে গিয়ে কেন পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলো না? কেন একজন যাত্রীকে প্রকাশ্যে মারধরের অভিযোগ উঠল? আর কেন অভিযানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকেও আগে জানানো হয়নি?

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ঘটনাটিতে ‘ভুলত্রুটি’ থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

মামলা, বরখাস্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা:
ঘটনার পর শনিবার সকালে নাঈম হাসানের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরী এবং পুলিশের সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগে মারধর ও অপহরণচেষ্টার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে অভিযুক্ত এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। পুলিশের সোর্স সোহেলকেও আটক করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী নাঈমের বাসায় গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

কেন ঘটনাটি সাধারণ কোনো নির্যাতনের অভিযোগ নয়?
এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার। তাঁর পরিচয়, জনপ্রিয়তা এবং বিসিবি ও ক্রিকেটাঙ্গনের দ্রুত হস্তক্ষেপের কারণে ঘটনাটি মুহূর্তেই জাতীয় আলোচনায় উঠে এসেছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে আরও গভীরে। যদি নাঈম হাসান জাতীয় দলের ক্রিকেটার না হতেন?

যদি তাঁর ফোন কেড়ে নেওয়ার পর তিনি বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল কিংবা প্রভাবশালী কাউকে ফোন করতে না পারতেন?

যদি ঘটনাস্থলে মানুষ জড়ো না হতো? এই প্রশ্নগুলোই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।

ক্রিকেটাঙ্গনের ক্ষোভ:
ঘটনার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

মুশফিকুর রহিম বলেছেন, নাঈমের সঙ্গে যা ঘটেছে তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান।

তাসকিন আহমেদ ঘটনাটিকে ‘ন্যক্কারজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

লিটন দাস বলেছেন, দেশের কোনো নাগরিকই এমন আচরণের শিকার হওয়ার যোগ্য নন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এখন নজর তদন্তে:
চট্টগ্রামের আলোচিত এই ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এটি কি কেবল একটি ‘ভুল অভিযান’, নাকি মাঠপর্যায়ের ক্ষমতার অপব্যবহারের আরেকটি উদাহরণ?

তদন্তের ফলই নির্ধারণ করবে, জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানের অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয় এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট—লালখান বাজারের সেই রাত শুধু একজন ক্রিকেটারের নয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।