
বিশ্বকাপের মঞ্চে ১৬ বছর আগের সেই স্মৃতি এখনও অনেকের মনে জ্বলজ্বল করে। ২০১০ সালের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা। সেদিন লড়াই শেষ হয়েছিল ১-১ সমতায়।
তবে ২০২৬ সালে এসে একই দুই দলের সাক্ষাতে গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। এবার আর কোনো সমতা নয়, ছিল কেবল মেক্সিকোর আধিপত্য আর স্বাগতিক সমর্থকদের উৎসব।
‘এ’ গ্রুপের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে মেক্সিকো।
৮৩ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামের ৯৭ শতাংশ পূর্ণ করা সমর্থকদের সামনে ঘরের দল এমন একটি জয় পেয়েছে, যা শুধু তিন পয়েন্টই এনে দেয়নি, গ্রুপ পর্বের শুরুতেই তাদের চালকের আসনেও বসিয়ে দিয়েছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে মেক্সিকো। এর ফলও আসে খুব দ্রুত। ম্যাচের মাত্র ৯ মিনিটে এরিক লিরার নিখুঁত পাস থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন জুলিয়ান কুইনোনেস।
বিশ্বকাপের এই আসরের উদ্বোধনী ম্যাচের প্রথম গোলটি করে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখে ফেলেন এই ফরোয়ার্ড। গ্যালারিতে তখন উৎসবের ঢেউ, আর মাঠে মেক্সিকোর আত্মবিশ্বাস আকাশছোঁয়া।
প্রথম গোলের পর দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও বলের নিয়ন্ত্রণ কিংবা আক্রমণ গঠনে তারা কখনোই স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পায়নি। মেক্সিকোর সংগঠিত প্রেসিং ও দ্রুত পাসিংয়ের সামনে আফ্রিকান দলটিকে বেশ অসহায়ই দেখাচ্ছিল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি আসে। ৪৯তম মিনিটে দক্ষিণ আফ্রিকার স্ফেফেলো সিতোলে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। এক খেলোয়াড় কমে যাওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য ম্যাচে টিকে থাকাই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ।
সংখ্যাগত সুবিধা পাওয়ার পর আরও বেশি আক্রমণ শানাতে থাকে মেক্সিকো। অবশেষে ৬৭তম মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত দ্বিতীয় গোল।
রোবার্তো আলভারাদোর দারুণ ক্রস থেকে অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রাউল জিমেনেস শক্তিশালী হেডে বল জালে জড়ান। সেই গোলের পর কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়।
শেষ দিকে ৯০+২ মিনিটে সেজার মন্তেস লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ায় কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে মেক্সিকো।
তবে ততক্ষণে দক্ষিণ আফ্রিকার ফিরে আসার মতো সময় কিংবা শক্তি—কোনোটাই অবশিষ্ট ছিল না। শেষ বাঁশি বাজতেই শুরু হয় স্বাগতিক সমর্থকদের উল্লাস।
ম্যাচের পরিসংখ্যানও মেক্সিকোর একচ্ছত্র আধিপত্যের সাক্ষ্য দেয়। বল দখলে তাদের ছিল ৬২ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার ছিল মাত্র ৩৮ শতাংশ। মেক্সিকো পুরো ম্যাচে ১৬টি শট নেয়, বিপরীতে দক্ষিণ আফ্রিকা নিতে পেরেছে মাত্র ৩টি।
প্রতিপক্ষের বক্সে বল স্পর্শের সংখ্যাও দুই দলের পার্থক্য স্পষ্ট করে—মেক্সিকো ২০ বার, দক্ষিণ আফ্রিকা মাত্র ২ বার।
আক্রমণভাগে দক্ষিণ আফ্রিকার অসহায়ত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রত্যাশিত গোলের (xG) পরিসংখ্যানে। মেক্সিকোর xG ছিল ১.৪৪, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার ছিল মাত্র ০.০৭। অর্থাৎ পুরো ম্যাচজুড়ে তারা কার্যকর কোনো আক্রমণই গড়ে তুলতে পারেনি।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ সাধারণত চাপ, প্রত্যাশা আর স্নায়ুচাপের গল্প হয়ে থাকে। কিন্তু মেক্সিকো সেই চাপকে শক্তিতে রূপান্তর করেছে।
জুলিয়ান কুইনোনেসের ইতিহাস গড়া গোল, রাউল জিমেনেসের অভিজ্ঞতার ছাপ এবং পুরো দলের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্স মিলে প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে স্বাগতিকরা।
বিশ্বকাপ তো সবে শুরু। সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তবে প্রথম রাতের পারফরম্যান্স দেখে মেক্সিকো সমর্থকরা স্বপ্ন দেখতেই পারেন।
২০১০ সালে যে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে উদ্বোধনী ম্যাচে জয়ের আক্ষেপ ছিল, ২০২৬ সালে সেই আক্ষেপ মুছে দিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম রাতটিকে নিজেদের উৎসবে পরিণত করল মেক্সিকো।






















আপনার মতামত লিখুন :