চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর উপসর্গে নতুন চিত্র,জ্বর কম-বিপদ বেশি: ২১ দিনেই আক্রান্ত ৩০৫


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : জুলাই ২২, ২০২৬, ১:৪৮ অপরাহ্ন /
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর উপসর্গে নতুন চিত্র,জ্বর কম-বিপদ বেশি: ২১ দিনেই আক্রান্ত ৩০৫

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এক আশঙ্কাজনক ও ভিন্নমাত্রার মোড় নিয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে যে পরিমাণ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, চলতি জুলাই মাসের মাত্র ২১ দিনেই সেই সংখ্যা পার হয়ে গেছে!

শুধু তাই নয়, এবার ডেঙ্গু তার চিরাচরিত রূপ বদলে বেশ গোপনে শরীরকে কাবু করে ফেলছে-যেখানে উচ্চমাত্রার জ্বর কিংবা শরীরে র‍্যাশের মতো চেনা উপসর্গ অনুপস্থিত থাকলেও তৈরি হচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলায় মোট ৬০৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। যার মধ্যে কেবল চলতি জুলাই মাসের প্রথম তিন সপ্তাহেই (২১ দিনে) আক্রান্ত হয়েছেন ৩০৫ জন। অথচ গত জানুয়ারি থেকে জুন-এই ছয় মাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৯৮ জন।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবছরই জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। বছরের মোট আক্রান্তের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ রোগী এই পাঁচ মাসেই হাসপাতালে ভর্তি হন। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৪ হাজার ৬৭ জন। ওই বছর মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৮৪৬ জন। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে।

তবে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মতে, গত কয়েক বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এখনো তুলনামূলক কম হলেও সংক্রমণের গতি দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরে জানুয়ারি–জুন (৬ মাস) মাসে আক্রান্ত ২৯৮ জন, জুলাই (প্রথম ২১ দিন) আক্রান্ত ৩০৫ জন, মোট আক্রান্ত (গতকাল পর্যন্ত) ৬০৩ জন।

এবার ডেঙ্গুর উপসর্গে স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। আগের মতো রোগীদের উচ্চমাত্রার জ্বর কিংবা শরীরে লালচে র‍্যাশ দেখা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) এ এস এম লুৎফুল কবির বলেন, এবার অনেক রোগীর উচ্চমাত্রার জ্বর হচ্ছে না। শরীরে র‍্যাশও তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বমি, তীব্র পেটব্যথা, ডায়রিয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা এবং লিভার ও কিডনির জটিলতা নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে আসছেন।

কিছু রোগীর মধ্যে শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’ এর প্রবণতাও তুলনামূলক বেশি, এতে রক্তচাপ দ্রুত কমে যেতে পারে।

তাই সামান্য জ্বরকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা করা ঠিক হবে না। জ্বর হলেই দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর মূল চিকিৎসা হলো শরীরের তরলের (ফ্লুইড) সঠিক ব্যবস্থাপনা। জ্বর কমে যাওয়ার পরেই সাধারণত প্লাটিলেট কমতে শুরু করে।

প্লাটিলেটের সংখ্যা ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়, তখন নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

সাধারণত নগরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা গেলেও এবার চট্টগ্রামজুড়ে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে ভর্তি হওয়া ৩০৫ জনের মধ্যে ১৮৪ জনই নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা, আর নগর থেকে ভর্তি হয়েছেন ১২১ জন। সর্বোচ্চ আক্রান্ত সীতাকুণ্ড উপজেলায় (৫৯ জন)। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্ণফুলী উপজেলায় (৩১ জন)।

গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৬ জন (নগরের ৭ জন, উপজেলার ৬ জন, অন্য জেলার ৩ জন)।

জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ৯২ জন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত দুজনের মৃত্যু হয়েছে-যাঁদের একজন সীতাকুণ্ডের এবং অপরজন নগরের পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা।

চট্টগ্রামের ডেঙ্গু আক্রান্ত ৯৫ ভাগ রোগীই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বা নিয়েছেন।

চমেক হাসপাতালের ১৬ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা কর্ণফুলী উপজেলার কাঠমিস্ত্রি শাহ আলম (৪০) তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, তিন দিন আগে হঠাৎ জ্বর আসে। ভেবেছিলাম সাধারণ জ্বর, স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেয়েছিলাম।

কিন্তু জ্বর কমছিল না, তীব্র মাথাব্যথা, হাত-পা ব্যথা আর শরীর প্রচণ্ড দুর্বল লাগছিল। পরে পরীক্ষা করিয়ে জানতে পারি ডেঙ্গু হয়েছে। কাজের সূত্রে সারাদিন বাইরে থাকি, কোথা থেকে মশা কামড়েছে বুঝতে পারছি না।

গত জুনে স্বাস্থ্য বিভাগের করা এক জরিপে চট্টগ্রামের প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৭টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। চলতি মাসের ভারী বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় মশার প্রজনন বহুগুণ বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে হাসপাতালগুলোতে।

সম্প্রতি অপর এক জরিপে নগরের ৮টি ওয়ার্ডকে এডিস মশার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা বা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, ওয়ার্ডগুলো হলো, উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম জানান, “আমাদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি হটস্পটগুলোতে মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য ৬০ জনের একটি প্রশিক্ষিত টিম তৈরি করা হয়েছে।

এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন সকাল-বিকেল লার্ভিসাইড ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, ফগিংও চলছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামাল দিতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মানুষের সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাসাবাড়ি ও আশপাশে কোথাও যাতে পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা নিলে এবং সচেতন থাকলে এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।