
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং পারস্পরিক হুমকি-পাল্টা হুমকির পর অবশেষে এমন এক ঘোষণা এসেছে, যা বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল আলোচিত ‘শান্তি চুক্তি’ চূড়ান্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) ভোররাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় শেহবাজ শরিফ এই তথ্য প্রকাশ করেন।
এরপর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায় যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও ট্রুথ সোশ্যালে লিখেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন।”
ট্রাম্পের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে হরমুজ প্রণালির প্রসঙ্গ। তিনি ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালি আবারও টোলমুক্তভাবে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর আরোপিত অবরোধও অবিলম্বে তুলে নেওয়া হবে।
এমন ঘোষণা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে চুক্তির বিষয়টি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেয়নি ইরান সরকার। যদিও দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে উদ্ধৃত করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার খবর প্রচার করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উপস্থাপক দাবি করেন, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান এবং রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টের সঙ্গে সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তিতে আসতে হয়েছে।
ফলে দেশটির অনেক গণমাধ্যম এই ঘটনাকে ‘ইরানের কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরছে।
ঘটনাপ্রবাহকে আরও নাটকীয় করে তুলেছে লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার সাম্প্রতিক ঘটনা। রোববারের ওই হামলার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষ থেকেই তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। ইরানের আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পালনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
একই সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈরুত হামলার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি দেয়।
এমনকি দেশটির সামরিক কমান্ড জানায়, তাদের ‘আঙুল ট্রিগারে রয়েছে’ এবং তারা ‘শত্রুর হৃৎপিণ্ড’ লক্ষ্য করে আঘাত হানতে প্রস্তুত।
এই উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থার মধ্যেই শান্তি চুক্তির খবর সামনে আসা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্প নিজেও বৈরুত হামলার সমালোচনা করে বলেন, এমন একটি দিনে হামলা হওয়া উচিত হয়নি, যখন উভয় পক্ষ শান্তি চুক্তির এত কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, এর আওতায় লেবাননসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ইরানের আটকে থাকা ২৫ বিলিয়ন ডলার সম্পদ মুক্ত করার সম্ভাবনা। খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এই অর্থ ছাড় করতে পারে।
বিনিময়ে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক স্থাপনা সম্প্রসারণ না করার বিষয়ে সম্মত থাকবে বলে জানা গেছে।
তবে এই সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসরায়েলের অবস্থান। তেল আবিব ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা এই চুক্তির অংশ নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে লেবাননে সামরিক অভিযান কমানোর বিষয় নিয়ে মতপার্থক্যের খবর নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই চুক্তি বাস্তবে কার্যকর হয়, তাহলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়ও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর ও বাস্তবায়নের আগে
এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি। তাই আগামী শুক্রবারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে পুরো বিশ্ব। সূত্র-সিএনএন






















আপনার মতামত লিখুন :