
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতি ও দেশের শ্রমিক আন্দোলনের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নতুন ইতিহাস গড়ার পথে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
অর্থবছর শেষে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন মাইলফলক স্থাপনের আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে বন্দরে ৩২ লাখ ২০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার, ৯ কোটি ৯৫ লাখ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৩ হাজার ৯৫২টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তিন ক্ষেত্রেই বেড়েছে কার্যক্রমের পরিমাণ।
বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে মোট ৩৫ লাখ ৪২ হাজার টিইইউএস কনটেইনার, ১০ কোটি ৬৯ লাখ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৪ হাজার ৩১৭টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। লক্ষ্য অর্জিত হলে এটি হবে চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (মেরিন অ্যান্ড হারবার) কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, ‘‘চলতি অর্থবছরে ৪ হাজার ৩০০টির বেশি জাহাজ বন্দরে আসবে বলে আমরা আশা করছি।
কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিং—তিন ক্ষেত্রেই অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করা সম্ভব হবে।’’
বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও দেশের আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকায় এই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আকতার পারভেজ বলেন, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বৃদ্ধির পেছনে ব্যবসায়ীদের আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তাঁর মতে, স্থিতিশীল সরকারের প্রতি ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়ায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ইতিবাচক গতি এসেছে। এই স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে।
চলতি অর্থবছরের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১৬ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং জাহাজ আগমনে ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বন্দরসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ব্যস্ততম ১০০ বন্দরের মধ্যে বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৮তম। চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে আরও ওপরে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়।
ফলে বন্দরের কার্যক্রমে এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিকে শুধু একটি বন্দর-সাফল্য হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দরের এই অগ্রযাত্রা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক সংকেত হয়ে উঠেছে।
এখন নজর অর্থবছরের শেষ হিসাবের দিকে—সত্যিই কি নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর।






















আপনার মতামত লিখুন :