
স্কোরবোর্ডে মাত্র ২ ওভার সম্পন্ন। রান শূন্য। অথচ অস্ট্রেলিয়ার তিনটি উইকেট নেই। চোখ কচলে আবারও স্কোর দেখার মতো অবস্থা। প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ, আর দলটি সত্যিই অস্ট্রেলিয়া-বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি।
ঘটনার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয় একটি পরিসংখ্যানে। ওয়ানডে ইতিহাসে ১০২৪ ম্যাচ খেলার পর এই প্রথম শূন্য রানে ৩ উইকেট হারাল অস্ট্রেলিয়া। আর দিনশেষে তারা সাক্ষী হলো আরও একটি প্রথমের। বাংলাদেশের কাছে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ হারার।
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে এমন এক দিন, যা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আগের ম্যাচেও ম্যাথু শর্টকে বোলিংয়ের জাদুতে বিভ্রান্ত করেছিলেন তাসকিন আহমেদ। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। ইনিংসের শুরুতেই বল ছেড়ে দিতে গিয়ে দেখলেন নিজের স্টাম্প ভেঙে গেছে।
এরপর মোস্তাফিজুর রহমানের ওভারে আরও বড় ধাক্কা। প্রথম বলে কুপার কনোলি লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দিলেন। ওভারের শেষ বলে একই পরিণতি হলো ম্যাট রেনশরও।
মাত্র ২ ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ০/৩। ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনারই ডাক মেরেছেন—এমন ঘটনা ঘটল মাত্র তৃতীয়বার।
প্রথম ধাক্কার পর অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে জস ইংলিসের ব্যাটে। অ্যালেক্স ক্যারির সঙ্গে ২৫ রানের এবং ক্যামেরন গ্রিনের সঙ্গে ৩৮ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
কিন্তু তানভীর ইসলামের আঘাতে আবারও ছন্দ হারায় সফরকারীরা। ৮১ রানেই ৬ উইকেট হারিয়ে বড় বিপদে পড়ে অস্ট্রেলিয়া।
সেখান থেকে ক্যামেরন গ্রিন ও মার্নাস লাবুশেন অসাধারণ ধৈর্যের পরিচয় দেন। সপ্তম উইকেটে ১১৫ বলে ১০৩ রানের জুটি গড়ে তাঁরা দলকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনেন।
তবে শেষ হাসি ছিল বাংলাদেশের। তাসকিন আহমেদ পরপর দুই বলে ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যাডাম জাম্পাকে বোল্ড করে অস্ট্রেলিয়ার পুনরুত্থানের স্বপ্নে বড় আঘাত হানেন।
এর কিছুক্ষণ পরই নামে বৃষ্টি। ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রানেই থেমে যায় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। ডিএলএস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪১ ওভারে ১৯২ রান।
তবে রান তাড়ায় শুরুতেই ধাক্কা। লক্ষ্য খুব বড় ছিল না, কিন্তু কাজটাও সহজ হয়নি। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই ফিরে যান তানজিদ হাসান। এরপরও সুযোগ তৈরি করেছিল অস্ট্রেলিয়া।
জেভিয়ার বার্টলেট নিজের বলে নাজমুল হোসেন শান্তর ক্যাচ ফেলেন। পরের বলেই এলবিডব্লুর সিদ্ধান্ত হলেও রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান বাংলাদেশ অধিনায়ক।
সেই জীবনই পরে বড় হয়ে ওঠে। পরে কিছুটা সতর্ক থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও সৌম্য সরকার।
চমৎকার সব ড্রাইভ, কাট ও পুলে তাঁরা অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের চাপে ফেলেন। দুজন মিলে ৯৩ বলে ৮৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে জয়ের ভিত তৈরি করে দেন।
তবে দুজনেরই আক্ষেপ থেকে যায়। ফিফটির খুব কাছে গিয়ে ফিরতে হয় তাঁদের।
শান্ত ও সৌম্যের বিদায়ের পর বাংলাদেশ কিছুটা চাপে পড়ে যায়। ১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ম্যাচে উত্তেজনা ফিরে আসে। কিন্তু তখন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাওহিদ হৃদয় ও মেহেদী হাসান মিরাজ।
দুজন মিলে ৪৮ বলে অবিচ্ছিন্ন ৫১ রানের জুটি গড়ে সব শঙ্কা দূর করে দেন। ম্যাচের মাঝপথে মাথায় বল লেগে শারীরিক অস্বস্তিতে পড়া মিরাজ শেষ পর্যন্ত ছক্কা মেরে জয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
৩৫ ওভারে ৫ উইকেট হাতে রেখেই লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে বাংলাদেশ।
এই জয়ের মাধ্যমে তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ নিশ্চিত করে ফেলেছে বাংলাদেশ। এটি শুধু আরেকটি সিরিজ জয় নয়, এটি বহু বছরের অপেক্ষার অবসান।
ঘরের মাঠে টানা পঞ্চম ওয়ানডে সিরিজ জয়ের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় এক অর্জন।
টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে এতদিন শুধু ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জেতা হয়নি বাংলাদেশের।
মিরপুরের এই ঐতিহাসিক সন্ধ্যায় সেই তালিকা থেকে অস্ট্রেলিয়ার নামও মুছে গেছে।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অনেক গৌরবময় অধ্যায় আছে। কিন্তু শূন্য রানে তিন উইকেট ফেলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চাপে ফেলে দেওয়া, তারপর প্রথমবারের মতো তাদের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ নিশ্চিত করা—এমন গল্প খুব বেশি নেই।
মিরপুরের আকাশে সেদিন শুধু একটি জয় উদযাপিত হয়নি, উদযাপিত হয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের আরেকটি স্বপ্নপূরণ।
আর সেই কারণেই এই ম্যাচ, এই সিরিজ এবং এই দিনটি দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।






















আপনার মতামত লিখুন :