
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালির কাছে টানা ১১৫ দিন আটকা থাকার পর অবশেষে দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ১৭ নাবিক।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, মৃত্যুঝুঁকি আর চরম আতঙ্কের দিন পেরিয়ে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) তারা দেশে ফেরেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরে নতুন ক্রুদের কাছে জাহাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটে এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তারা।
বিএসসি সূত্রে জানা যায়, সরকার ও সংস্থার নিবিড় কূটনৈতিক তদারকির পর গত ২৩ জুন ‘বাংলার জয়যাত্রা’ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে।
এরপর ৩৭ হাজার ৫০০ টন সার নিয়ে জাহাজটি দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরে পৌঁছালে সেখানে ক্রু পরিবর্তন করা হয়।
নতুন করে ১৭ জন ক্রু জাহাজটির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তারা শিগগিরই জাহাজটি নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।
তবে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছানোটা মোটেও সহজ ছিল না। সেই ভয়ংকর সময়ের কথা বলতে গিয়ে ‘বাংলার জয়যাত্রা’র মাস্টার ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খান যেন ফিরে যান মৃত্যুর মুখোমুখি সেই দিনগুলোতে।
তিনি বলেন, শত শত ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের জাহাজের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে। জেবেল আলি বন্দরে মাত্র ২০০ মিটার দূরে একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। চরম ঝুঁকির মধ্যেও দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় আমরা জাহাজ ছেড়ে যাইনি।
শুধু আকাশপথের হামলার আশঙ্কাই নয়, সমুদ্রপথেও ছিল ভয়াবহ বিপদ। জাহাজটির সেকেন্ড অফিসার প্রণয় কৃষ্ণ সেন জানান, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি সমুদ্রে ভাসমান মাইনের আতঙ্কও ছিল।
এর মধ্যেই জাহাজের অটো-ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ে। ফলে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জাহাজ চালিয়ে বিপৎসংকুল পথ পাড়ি দিতে হয় তাদের।
দীর্ঘ এই সংকটকালে নাবিকদের মনোবল ধরে রাখাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিএসসি’র জাহাজ-জনবল বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান জানান, নাবিকদের মানসিক শক্তি জোগাতে উচ্চগতির ইন্টারনেট, পর্যাপ্ত খাবার ও প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছিল।
তিনি জানান, সংঘাতের পরিস্থিতি কিছুটা প্রশমিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসসি।
সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেকের নেওয়া এই দ্রুত সিদ্ধান্তই নাবিকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বিএসসি সূত্র জানায়, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে কাতারের মেসাইয়িদ বন্দর থেকে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে পৌঁছেছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’।
এরপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিকসহ জাহাজটি পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে।
দীর্ঘ ১১৫ দিন ধরে যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে সাগরে অবস্থান করতে হয়েছে তাদের। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেছে ক্ষেপণাস্ত্র, সামনে ছিল ড্রোন হামলার শঙ্কা, আর সমুদ্রপথে ছিল ভাসমান মাইনের আতঙ্ক।
এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে যায় অটো-ন্যাভিগেশন ব্যবস্থাও। তবু দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি নাবিকেরা।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হরমুজ প্রণালির বিপৎসংকুল পথ পেরিয়ে ডারবান বন্দরে পৌঁছে জাহাজের দায়িত্ব নতুন ক্রুদের হাতে তুলে দেন তারা।
এরপর এমিরেটসের ফ্লাইটে দেশে ফিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন ১৭ নাবিক।
মৃত্যুর ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তায় ভরা ১১৫ দিনের সেই দুঃসহ অধ্যায়ের পর তাদের দেশে ফেরা যেন এক দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান-একটি নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের গল্প।






















আপনার মতামত লিখুন :