
বিশ্বকাপের মঞ্চে কিছু ফুটবলার শুধু ম্যাচ জেতান না, নিজেদের জন্য আলাদা এক ইতিহাসও লিখে যান। ফিলাডেলফিয়ার রাতটি ছিল ঠিক তেমনই একটি রাত, যেখানে ফ্রান্সের ৩-০ গোলের জয়ের গল্পের কেন্দ্রে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপে।
লিওনেল মেসি টুর্নামেন্টে দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, গোলের মহাযুদ্ধে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই এমবাপে।
ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি পৌঁছে গেছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের অন্যতম মিরোস্লাভ ক্লোসার পাশে। দুজনেরই গোলসংখ্যা এখন ১৬।
তবে সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বিস্ময়কর এক তথ্য। বিশ্বকাপে ১৬ গোল করতে মেসির লেগেছে ২৭ ম্যাচ, আর এমবাপে সেই মাইলফলকে পৌঁছেছেন মাত্র ১৬ ম্যাচে। আধুনিক ফুটবলে এমন ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতা খুব কম খেলোয়াড়ই দেখাতে পেরেছেন।
ফ্রান্সের জন্য ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ‘আই’ গ্রুপ থেকে নকআউট নিশ্চিত করার সুযোগ ছিল তাদের সামনে। আর সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নেন এমবাপে।
ম্যাচের ১৪তম মিনিটে মাইকেল অলিসের পাস পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ-পায়ের দুর্দান্ত শটে গোল করেন তিনি। মুহূর্তেই এগিয়ে যায় ফ্রান্স। বিশ্বকাপে এটি ছিল এমবাপের ১৫তম গোল।
এরপর ম্যাচের গতি থামিয়ে দেয় প্রকৃতি। বজ্রপাত ও প্রবল বৃষ্টির কারণে প্রথমার্ধ শেষে প্রায় আড়াই ঘণ্টা খেলা বন্ধ থাকে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর যখন দুই দল আবার মাঠে নামে, তখনও ফরাসি আক্রমণের মূল চরিত্র ছিলেন এমবাপে।
৫৪তম মিনিটে ইরাকের রক্ষণভাগের ভুল থেকে আসে দ্বিতীয় গোল। গোলরক্ষক জালাল হাসান বাসিল চাপে পড়ে বল হারালে সুযোগটি কাজে লাগান ওসমান দেম্বেলে।
তার নিঃস্বার্থ পাস থেকে সহজেই বল জালে পাঠান এমবাপে। সেই গোলেই তিনি ছুঁয়ে ফেলেন ক্লোসার ১৬ গোলের বিশ্বকাপ রেকর্ড।
বিশ্লেষকদের মতে, এমবাপের বিশেষত্ব শুধু গোলসংখ্যায় নয়; বড় মঞ্চে ধারাবাহিকভাবে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতায়।
২০১৮ সালে কিশোর তারকা হিসেবে বিশ্বকাপ জয়, ২০২২ সালে ফাইনালে হ্যাটট্রিক এবং এবারও গোলের ধারাবাহিকতা—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপকে যেন নিজের সবচেয়ে প্রিয় মঞ্চ বানিয়ে ফেলেছেন তিনি।
এমবাপের দ্বিতীয় গোলের পর ফ্রান্স আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ৬৬তম মিনিটে আবারও অলিসের নিখুঁত পাস থেকে গোল করেন ওসমান দেম্বেলে।
আন্তর্জাতিক বড় কোনো টুর্নামেন্টে এটি ছিল পিএসজি তারকার প্রথম গোল। একই সঙ্গে ম্যাচে নিজের তৃতীয় অ্যাসিস্ট করেন অলিসে।
স্কোরলাইন ৩-০ হলেও ম্যাচের গল্প শুধু ফলাফলে সীমাবদ্ধ ছিল না। এমবাপে আরও কয়েকবার হ্যাটট্রিকের খুব কাছে পৌঁছেছিলেন। ৮০তম মিনিটে পেনাল্টির আবেদন করেছিলেন, সাড়া মেলেনি।
অতিরিক্ত সময়েও ইরাকের রক্ষণভাগের ভুলে একা এগিয়ে গিয়েছিলেন গোলরক্ষকের দিকে, কিন্তু শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় হ্যাটট্রিক আর পূর্ণ হয়নি।
অন্যদিকে ইরাকও লড়াই করেছে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী। ৭৬তম মিনিটে আলি আল হামাদির প্রচেষ্টা পোস্টের বাইরে চলে গেলে তাদের সান্ত্বনার গোলের সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়।
শেষদিকে দিদিয়ের দেশমে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দেন। বারকোলা, অলিসে, দেম্বেলে, কুন্দে এবং এমবাপেকে তুলে নিয়ে মাঠে নামান রায়ান চেরকি, দেজিরে দুয়ে, মাগনেস আকলিউশ, মালো গুস্তো ও মার্কাস থুরামকে।
তবে ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজনই—কিলিয়ান এমবাপে। ক্লোসার পাশে বসে তিনি এখন তাকিয়ে আছেন আরও উঁচুতে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনটি আর খুব দূরে নয়। আর বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় সেই সিংহাসনের সবচেয়ে শক্ত দাবিদারও সম্ভবত তিনিই।






















আপনার মতামত লিখুন :