রক্ত, অগ্নি আর অশ্রুর দিন: মুজাফরাবাদ গণহত্যা দিবস পালিত হবে আগামীকাল


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : মে ২, ২০২৬, ১২:২০ অপরাহ্ন /
রক্ত, অগ্নি আর অশ্রুর দিন: মুজাফরাবাদ গণহত্যা দিবস পালিত হবে আগামীকাল

১৯৭১ সালের ৩ মে। দিনটি ছিল সোমবার। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুজাফরাবাদ গ্রামে সেদিন ভোর নামে রক্তাক্ত অন্ধকার হয়ে।

সূর্যের আলো ওঠার আগেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, এদেশীয় দালালদের সহযোগিতায়, চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে পুরো গ্রাম। মুহূর্তেই শান্ত-নিরীহ জনপদ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।

তারপর শুরু হয় এক নারকীয় তাণ্ডব। আগুনে পুড়তে থাকে ঘরবাড়ি, লুট হয়ে যায় সহায়-সম্বল। চারদিকে শুধু আর্তনাদ, ধোঁয়া আর ছুটে বেড়ানো মানুষের হাহাকার। দিনভর চলে অমানবিক নির্যাতন।

আলবদর মদতপুষ্ট পাকিস্তানি খান সেনারা এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় গ্রামের নারী-পুরুষদের ধরে নিয়ে যায়।

পরে সাড়ে তিনশ’রও বেশি বাঙালি হিন্দুকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ, মা থেকে মেয়ে—কেউ রেহাই পায়নি সেই পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ থেকে।

মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল অসংখ্য নিথর দেহ। স্বজন হারানোর আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছিল আকাশ-বাতাস।

এই গণহত্যায় নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৫৫ জনের নাম উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু কত নাম হারিয়ে গেছে ইতিহাসের অন্ধকারে, তার সঠিক হিসাব আজও অজানা।

শুধু প্রাণহানিই নয়, মুজাফরাবাদে সেদিন সংঘটিত হয়েছিল নারীত্বের ওপর নির্মমতম আঘাত। অসংখ্য নারী ধর্ষণ, লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের শিকার হন।

সামাজিক লজ্জা, মানসিক যন্ত্রণা আর অসহনীয় স্মৃতি বয়ে বেড়াতে না পেরে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে যান। কেউ আশ্রয় নেন ভারতে, কেউ বেছে নেন আত্মহননের পথ।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে অন্তত তিনজন বীরাঙ্গনা নারীর কথা, যাঁদের মধ্যে দুজন লোকলজ্জার ভয়ে পরবর্তীতে ভারতে চলে যান।

৩ মে’র সেই রক্তাক্ত দিন শুধু শত শত প্রাণ কেড়ে নেয়নি; ধ্বংস করে দিয়েছিল একটি সমৃদ্ধ, প্রাণবন্ত জনপদের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও সামাজিক বন্ধন।

পরবর্তীতে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের নিয়মিত আক্রমণে মুজাফরাবাদ গ্রামটি সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকা মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যান। অনেকেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ত্রিপুরায় আশ্রয় নেন। কেউবা অস্ত্র হাতে যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীরা আবার ফিরে আসেন আপন ভিটেমাটিতে।

বুকভরা শোক, চোখভরা অশ্রু আর অসীম বেদনা নিয়েও তারা নতুন করে গড়ে তোলেন মুজাফরাবাদ। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শুরু হয় নতুন স্বপ্নের পথচলা। আর সেই পথচলার প্রেরণা হয়ে আছে ১৯৭১ সালের ৩ মে’র শহীদদের আত্মত্যাগ।

দীর্ঘদিন স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে মুজাফরাবাদে নির্মিত হয়েছে শহীদদের স্মরণে কেন্দ্রীয় শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ।

প্রতি বছর এখানে পুষ্পমাল্য অর্পণ, স্মরণসভা এবং নানা আয়োজনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। তবুও গ্রামজুড়ে আজও যেন বিরাজ করে কবরের নীরবতা। বাতাসে ভেসে আসে স্বজনহারাদের দীর্ঘশ্বাস, ইতিহাসের নীরব কান্না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী সংগঠন মুজাফরাবাদ সমন্বয় ও বধ্যভূমি সংরক্ষণ পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে এই গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস পৌঁছে দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

তাদের উদ্যোগে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আগামীকাল ৩ মে কেন্দ্রীয় শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ প্রাঙ্গণে পটিয়া উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পালিত হবে মুজাফরাবাদ গণহত্যা দিবস ২০২৬।

এবারের অনুষ্ঠানসূচিতে রয়েছে শহীদদের স্মরণে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার, স্মৃতি সৌধে পুষ্প শ্রদ্ধাঞ্জলি, শহীদদের স্মরণে স্মরণসভা এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান।

এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পটিয়া আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আলহাজ এনামুল হক এনাম। সম্মানিত অতিথি থাকবেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারহানুর রহমান, পটিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব খোরশেদ আলম, ১৭ নং খরনা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মফজল আহমদ চৌধুরী, পটিয়া থানার ওসি জিয়াউল হকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ, উপজেলা নেতৃবৃন্দ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

বধ্যভূমি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি প্রফেসর ড. তাপসী ঘোষ রায়ের সভাপতিত্বে স্মরণসভায় স্বাগত বক্তব্য রাখবেন সমন্বয় সভাপতি ও বধ্যভূমি সংরক্ষণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবু বিপ্লব সেন এবং সমন্বয় সাধারণ সম্পাদক বাবু কাজল কর।

স্মরণসভার সঞ্চালনা করবেন সমন্বয়ের অর্থ সম্পাদক রাজীব সেন এবং শিক্ষক সুমন চক্রবর্তী।

৩রা মে গণহত্যা দিবস উদযাপন পরিষদ ২০২৬-এর আহ্বায়ক বাবু প্রদীপ কর, সদস্য সচিব বাবু দেবাশীষ দে এবং যুগ্ম আহ্বায়ক বাবু নিউটন বিশ্বাস সংগঠনের সদস্য, এলাকাবাসী ও সর্বস্তরের জনসাধারণকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

মুজাফরাবাদ শুধু একটি গ্রামের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক রক্তাক্ত স্মারক। ৩ মে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার প্রতিটি অর্জনের পেছনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য প্রাণ, অগণিত অশ্রু আর অনির্বচনীয় ত্যাগের ইতিহাস।

মুজাফরাবাদের কান্না আজও থামেনি; সেই কান্নাই আমাদের শপথ করায়—শহীদদের আত্মদান কখনো বৃথা যেতে পারে না।