নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ আদায়: ঈদযাত্রায় সড়কে ‘মুনাফা উৎসব’


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : মে ২৭, ২০২৬, ১২:৩৬ অপরাহ্ন /
নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ আদায়: ঈদযাত্রায় সড়কে ‘মুনাফা উৎসব’

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের সড়কপথে শুরু হয়েছে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়।

নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে সারাদেশের বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে চলছে ভয়াবহ “ভাড়া নৈরাজ্য”, যেখানে অসহায় যাত্রীরা কার্যত পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

বুধবার (২৭ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি।

কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সিটি সার্ভিস ও দূরপাল্লার বাসে লাগামহীনভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের প্রায় সাড়ে আটশ দূরপাল্লার রুটের মধ্যে ২৭টি রুট পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে ২৬টি রুটেই অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

শুধু এসব রুটেই প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ৫ কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে। ঢাকা-খুলনা রুটে যেখানে সরকারি নির্ধারিত ভাড়া ৫৪১ টাকা, সেখানে আদায় করা হচ্ছে ১ হাজার টাকা।

ঢাকা-বরিশাল রুটে ৫৯২ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৮৫০ টাকা। এমনকি রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির দোতলা বাসেও একই রুটে ৭০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

একইভাবে ঢাকা-পটুয়াখালী রুটে ৫৭০ টাকার ভাড়া ১ হাজার টাকা, ঢাকা-শরীয়তপুর রুটে ২৩৩ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা, চট্টগ্রাম-বরগুনা রুটে ১ হাজার ১৯৭ টাকার ভাড়া ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ঢাকা-মাদারীপুর রুটে ২৫০ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

এছাড়া ঢাকা-গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর, শিবচর, ঝালকাঠি, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, ফেনী, কুমিল্লা, টেকেরহাট ও পিরোজপুরসহ অসংখ্য রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে ভয়ংকর জালিয়াতির চিত্র। ৫২ আসনের বাসে কৌশলে ৪০ আসনের ভাড়ার তালিকা টানিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

কোথাও কোথাও স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের কাছ থেকেও শেষ গন্তব্যের পুরো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, যাত্রীদের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে অনেক কাউন্টারে “যেতে হলে এই ভাড়া, না হলে টিকিট নেই”— এমন অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, পরিবহন শ্রমিকদের বেতন, ভাতা ও ঈদ বোনাস কার্যকর না থাকায় অনেক চালক ও সহকারীকেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে পুরো ব্যবস্থাটি এখন এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে।

সংগঠনটির মতে, এই লাগামহীন ভাড়া বাণিজ্যের প্রভাব শুধু যাত্রী ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, সড়কে চাঁদাবাজি, সামাজিক অস্থিরতা, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

নিম্নআয়ের বহু মানুষ বাধ্য হয়ে বাস ও ট্রেনের ছাদে, এমনকি পণ্যবাহী ট্রাকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি সুপারিশও দিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

এর মধ্যে রয়েছে— গণপরিবহনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভাড়া আদায় চালু, নগদ লেনদেন বন্ধ, চালকদের বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস নিশ্চিত করা, মহাসড়কে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ই-প্রসিকিউশন চালু এবং ঈদযাত্রা মনিটরিং কমিটিকে সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা।

প্রশ্ন উঠেছে— প্রতিবছর ঈদের আগে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির আশ্বাস দেওয়া হলেও কেন একই চিত্র বারবার ফিরে আসে?

ঘরমুখো মানুষের আবেগ ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এই ভাড়া বাণিজ্য আর কতদিন চলবে— এখন সেই উত্তর খুঁজছে সাধারণ যাত্রীরা।