রাতভর কান্না, সকালে লাশ: আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুমৃত্যু ঘিরে আতঙ্ক


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : মে ২৭, ২০২৬, ১:১৫ অপরাহ্ন /
রাতভর কান্না, সকালে লাশ: আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুমৃত্যু ঘিরে আতঙ্ক

রাজধানীর আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভয়াবহ এক ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। এসির গ্যাস লিকেজের ঘটনায় পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে থাকা অন্তত ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তবে স্বজনদের অনেকের দাবি, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ঘটনাকে ঘিরে হাসপাতালজুড়ে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও শোকের আবহ।

মঙ্গলবার রাতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় মৃত শিশুদের বয়স ছিল মাত্র এক থেকে দুই দিন। তারা সবাই পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, ওই ওয়ার্ডে ১১ জন মা ও ছয়জন সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু ছিলেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে রয়েছে এবং পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এদিকে হাসপাতালের করিডোরজুড়ে ছিল স্বজনদের আহাজারি। এক শিশুর দাদী কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠানো উচিত ছিল।

তিনি বলেন, তার নাতনিকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। ওষুধ কেনার জন্য কয়েক হাজার টাকাও খরচ করানো হয়। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর গিয়ে জানতে পারেন, শিশুটি আর বেঁচে নেই।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাতে ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স ছিলেন না। তার ভাষায়, “বাচ্চারা সারারাত কান্না করছিল। একে একে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। কিন্তু ঠিকমতো কেউ দেখছিল না।”

নিজের সন্তান হারানো আরেক মা জানান, রাতের দিকে প্রায় সব শিশুই কান্না, বমি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। কিন্তু তখন কেউ বুঝতে পারেননি, ভেতরে কী ঘটছে।

সকালে শিশুর অবস্থার অবনতি হলে তাকে বাইরে নেওয়া হয়। পরে এনআইসিইউতে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা প্রথমে আশ্বস্ত করলেও কিছু সময়ের মধ্যেই মৃত্যুসংবাদ দেন।

তিনি বলেন, ওয়ার্ডে অন্তত ১২ থেকে ১৩টি শিশু ছিল এবং অধিকাংশই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার পর একটি ব্রিফ করা হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. নাহিদা ইয়াসমিন বলেন, পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে প্রথমে দুটি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়।

পরে আবার ওয়ার্ডে ফিরিয়ে আনা হয়। সকাল ছয়টার দিকে শিশুদের আবারও অসুস্থতা দেখা দিলে তাদের পুনরায় এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে ভেন্টিলেশনে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত শিশুদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, তিনি রাতে ঘটনাটি ঘটেছে বলে জেনেছেন। হাসপাতালে গিয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

ঘটনার পর থেকেই এসির গ্যাস লিকেজ, অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা তৎপরতার ঘাটতি নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।

কীভাবে একই ওয়ার্ডে থাকা একের পর এক নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়ল, কেন দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে স্বজনরা।

একটি হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ড, যেখানে নতুন প্রাণের কান্না শোনার কথা, সেখানে এক রাতেই ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যু ও আতঙ্কের নিস্তব্ধতা। এখন সবার চোখ তদন্তের দিকে—এই মৃত্যুর দায় শেষ পর্যন্ত কার?