সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা: উন্নয়ন প্রকল্পের মাঝেই জনদুর্ভোগ


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ৫:২১ অপরাহ্ন /
সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা: উন্নয়ন প্রকল্পের মাঝেই জনদুর্ভোগ

গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের পর স্বস্তির বৃষ্টি নেমেছিল চট্টগ্রামে। কিন্তু সেই স্বস্তি খুব দ্রুতই পরিণত হয় দুর্ভোগে। মাত্র ঘণ্টাখানেকের মাঝারি বৃষ্টিতেই নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পরিণত হয় জলমগ্ন।

আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে টানা কয়েক ঘন্টার বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, হালিশহর, ইপিজেড, রহমতগঞ্জ, মুরাদপুর, শুলকবহর, বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, জঙ্গীশাহ’র মাজার ও বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় একই চিত্র। এসব এলাকার অলিগলির সড়কও পানির নিচে চলে যায়।

বিশেষ করে প্রবর্তক মোড়। সড়কে জমে থাকা নোংরা পানি, থমকে থাকা যানবাহন, আর বিপাকে পড়া মানুষ। মঙ্গলবার সকাল থেকে বৃষ্টি থেমে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরও অনেক এলাকায় পানি নামেনি।

কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও তারও বেশি। জলাবদ্ধতার কারণে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

প্রবর্তক মোড়: জলাবদ্ধতার পুরোনো কেন্দ্র, নতুন ভোগান্তি
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার আলোচনায় প্রবর্তক মোড় যেন এক স্থায়ী নাম। সোমবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রবর্তক এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় সাময়িকভাবে পানি নিষ্কাশনে বিঘ্ন ঘটছে।

ফলে খালের পানি উপচে সড়কে উঠে আসায় পুরো এলাকা কার্যত জলমগ্ন হয়ে পড়ে। জিইসি মোড়, গোলপাহাড় এবং আশপাশের সংযোগ সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রবর্তক মোড়ের অদূরে বদনা শাহ মাজারের সামনের সড়কে জমে থাকা পানিতে আটকা পড়ে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন।

পানিতে ডুবে থাকা সড়কে যানবাহন চলাচল ধীর হয়ে পড়ে। অনেক মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা মাঝপথে বিকল হয়ে যায়। বেশ কয়েকটি গাড়ি বিকল হয়ে সড়কের ওপরই পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

অনেককে কোমরসমান, কোথাও কোথাও গলাসমান পানি পেরিয়ে চলাচল করতে হয়েছে। পানির কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে রোড ডিভাইডারের ওপর দিয়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।

এ সড়কের পাশেই রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ফলে রোগী, স্বজন এবং জরুরি সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী জানান, প্রবর্তক এলাকার পাশে সিডিএর উন্নয়নকাজের কারণে সাময়িকভাবে পানি চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

নাগরিক দুর্ভোগ: প্রতিদিনের এক পুনরাবৃত্ত সংকট
হাসপাতালে স্বজনকে দেখতে বের হওয়া ছখিনা বেগম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সকালেই কাজ সেরে ফিরবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু গোলপাহাড় এলাকা পার হতে গিয়ে জমে থাকা পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, বৃষ্টির চেয়ে ভোগান্তিই যেন বেশি সময় ধরে থাকে।

কয়েকজন সিএনজি ও রিকশাচালকের সাথে কথা হলে তাদের মুখেও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তারা জানান, পানি জমে গেলে রাস্তার গর্ত বোঝার উপায় থাকে না। এতে যাত্রী ও চালক—উভয়ের জন্যই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সামান্য অসাবধানতাই বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

মনি আক্তার নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, স্কুলে যাওয়ার পথে জুতা হাতে নিয়ে হাঁটতে হয়েছে। সড়কে কোথায় গর্ত, কোথায় উঁচু—কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। প্রতিবার বৃষ্টি হলেই একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

এক অফিসগামী নারী জানান, রাস্তায় জমে থাকা দুর্গন্ধযুক্ত পানি এড়িয়ে চলার কোনো উপায় ছিল না। শেষ পর্যন্ত পোশাক ভিজিয়েই অফিসে যেতে হয়েছে। এটি শুধু অস্বস্তিকর নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করে।

ডিভাইডারের ওপর দিয়ে হাঁটা: নগর ব্যবস্থাপনার করুণ প্রতিচ্ছবি
সড়কে জমে থাকা পানি এড়িয়ে বহু পথচারীকে রোড ডিভাইডারের ওপর দিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। এটি যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি নগর অবকাঠামোর দুর্বলতাকেও স্পষ্ট করে। নগরবাসীর প্রশ্ন—একটু বৃষ্টিতেই যদি এমন অবস্থা হয়, তবে পূর্ণ বর্ষায় পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

চলমান কাজ, তবু মিলছে না সুফল
প্রবর্তক মোড় সংলগ্ন হিজড়া খালের সেতু এলাকায় বর্তমানে সংস্কারকাজ চলছে। খালের একাংশ ভরাট করে সেখানে যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই কাজের কারণেও পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের সড়কে পানি জমে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বর্ষা সামনে রেখে খাল-নালা পরিষ্কার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিয়মিত পরিষ্কার অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

একই সঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ৩৬টি খাল সংস্কারের বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও চলছে। বেশ কয়েকটি খালের কাজ শেষ হলেও হিজড়া খাল ও জামালখান খালের কাজ এখনো চলমান।

বৃষ্টি বাড়বে, তাপ কমবে—কিন্তু বাড়বে কি দুর্ভোগও?
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, কালবৈশাখীর প্রভাবে আগামী কয়েক দিন বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এতে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রকল্প শেষ হবে কবে, স্বস্তি মিলবে কখন?
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা আর মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি এখন নগর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

আর তাই আসন্ন বর্ষা সামনে রেখে গত সপ্তাহ থেকে মাসব্যাপী নালা-খাল পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এর অংশ হিসেবে নগরের বিভিন্ন খাল ও নালা পরিষ্কারে তদারকি করছেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

তারই ধারবাহিকতায় আজ বৃষ্টি উপেক্ষা করে মেয়র তার দপ্তরের উদ্ধতন কর্মকর্তাদের নিয়ে ক্রাশ প্রোগ্রাম হিসেবে পুরো চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি নালা-খাল পরিস্কার করার জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে পরিদর্শন করেছেন।

নগরীর আগ্রাবাদ গোসাইলডাঙ্গা এলাকায় জলাবদ্ধা পরিস্থিতি পরিদর্শনকালে মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, গত বর্ষা মৌসুমের আগে প্রায় ৬০ শতাংশের মত জলাবদ্ধতা যেভাবে কমিয়ে এনেছিলাম। তার চাইতে আরও বেশি জলাব্ধতা কমিয়ে আনতে আমরা বদ্ধপরিকর।

তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতা মুক্ত একটি শহর আমরা উপহার দেবো। তবে যারা সার্বক্ষনিকভাবে ময়লা ফেলছে তাদের উদ্দ্যেশে মেয়র বলেন, খাল-নালায় ময়লা আবর্জনা না ফেলে নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ময়লা ফেলবেন।

নগরবিদরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে প্রকল্প, খাল খনন, পরিষ্কার অভিযান—সবকিছু চললেও সামান্য বৃষ্টিতেই যদি নগর অচল হয়ে পড়ে, তবে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

নগরবাসী এখন আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান ও স্থায়ী সমাধান চান। কারণ, বৃষ্টির পানি নামতে সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা; কিন্তু এই দুর্ভোগের স্মৃতি থেকে যায় অনেক দীর্ঘ সময়।

জানা গেছে, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খাল সংস্কারের কাজ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। তবে হিজড়া খাল ও জামালখান খালের সংস্কারকাজ এখনো চলমান রয়েছে।