নালা পরিষ্কারে জোর, তবু প্রশ্ন নাগরিক দায়িত্বে: জলাবদ্ধতা রোধে মাঠে চসিক


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ২:১৬ অপরাহ্ন /
নালা পরিষ্কারে জোর, তবু প্রশ্ন নাগরিক দায়িত্বে: জলাবদ্ধতা রোধে মাঠে চসিক

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা কমাতে মাসব্যাপী নালা-নর্দমা পরিষ্কার কার্যক্রম জোরদার করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)।

বর্ষা সামনে রেখে নেওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য, দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা থেকে নগরবাসীকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেওয়া।

তবে শুধু করপোরেশনের উদ্যোগেই যে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকাল থেকে নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে পরিচালিত ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’-এর কার্যক্রম সরেজমিনে তদারকি করেন তিনি। দিনের শুরুতে তিনি ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গীবাজার ওয়ার্ডের জে. এম. সেন স্কুলের পেছনে অবস্থিত বান্ডেল খাল এলাকায় চলমান পরিষ্কার কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।

পরে তিনি ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ওয়ার্ডের বদর খালি খাল (ইসলাম কলোনি) এবং ৩৫ নম্বর বক্সিরহাটা ওয়ার্ডের দক্ষিণ মধ্যম পীতম্বরশাহ এলাকায় নালা-নর্দমা পরিষ্কার কার্যক্রম ঘুরে দেখেন।

পরিদর্শনকালে মেয়র সরাসরি বলেন, নগরের বহু নালা-নর্দমা এখন ময়লার স্তুপে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থাই জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ।

তাঁর ভাষায়, কিছু অসচেতন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দা যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলছেন। ফলে নালাগুলো কার্যত বর্জ্য ফেলার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই প্রবণতা বন্ধ না হলে জলাবদ্ধতা নিরসনের কোনো উদ্যোগই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জনগণকে সচেতন না করতে পারলে এ কর্মসূচি শতভাগ সফল হবে না।

তিনি নগরবাসীকে নিজ নিজ দোকান ও বাসার জন্য আলাদা ডাস্টবিন রাখার এবং নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলার আহ্বান জানান।

একই সঙ্গে ডাস্টবিন চুরির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা কেবল অবকাঠামোগত সংকট নয়; এটি নাগরিক আচরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা।

প্রতি বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় লাখো মানুষকে। সড়ক অচল হয়ে পড়ে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাহত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।

পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য ৩০৯ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্প
নগরকে সচল রাখতে যাঁরা প্রতিদিন নীরবে কাজ করে চলেছেন, সেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে চসিক।

মেয়র বলেন, পরিচ্ছন্ন কর্মীরা শহরের নীরব যোদ্ধা। তাঁদের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা সিটি কর্পোরেশনের অন্যতম অগ্রাধিকার।

বর্তমানে অনেক পরিচ্ছন্নতা কর্মী অস্বাস্থ্যকর ও অমানবিক পরিবেশে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। এ বাস্তবতা বদলাতে তাঁদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রকল্প সংশোধন অনুযায়ী, মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০৯ কোটি ৩৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর আগে এ ব্যয় ছিল ২৩১ কোটি ৪২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।

ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের হালনাগাদ রেট সিডিউল এবং পরামর্শকের নতুন নকশা অনুযায়ী নির্মাণ ব্যয় পুনর্নির্ধারণকে উল্লেখ করেন মেয়র।

প্রকল্পের আওতায় সাতটি ভবনে মোট ১,০৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে প্রায় ৬০০ বর্গফুট। এসব ফ্ল্যাটে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিকল্পিত পরিবেশে বসবাসের সুযোগ পাবেন।

স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বান্ডেল কলোনিতে নির্ধারিত দুটি ভবনের একটি নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। তাই ওই ভবনটি ৩০ নম্বর পূর্ব মাদারবাড়ী ওয়ার্ডে চসিকের নিজস্ব জায়গায় নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্প এলাকায় বসবাসরত সেবকদের পুনর্বাসনে সময় লাগায় কাজ শুরুতে বিলম্ব হয়েছে। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

নাগরিক সচেতনতা ছাড়া সমাধান অসম্ভব
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে নালা পরিষ্কার, খাল পুনরুদ্ধার কিংবা অবকাঠামো উন্নয়ন—সবই জরুরি। কিন্তু নাগরিক দায়িত্ববোধ ছাড়া এসব উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

নগরবাসী যদি খাল-নালা দখল, ময়লা ফেলা এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রবণতা থেকে সরে না আসে, তাহলে প্রতি বছর একই সংকট ফিরে আসবে।

চসিকের বর্তমান অভিযান তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন প্রশাসনের ধারাবাহিক তদারকি, কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী, উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্মা, ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি, মেয়রের একান্ত সহকারী (রাজনৈতিক) জিয়াউর রহমান জিয়া, মেয়রের একান্ত সহকারী মারুফুল হক চৌধুরীসহ স্থানীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দ।