
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের মানুষকে নাড়া দেওয়া শিশু আয়াত হত্যা মামলায় অবশেষে রায় এসেছে।
চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস আদালত পাঁচ বছরের শিশু আয়াতকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে আসামি আবির আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
বুধবার (১৭ জুন) ঘোষিত এই রায়ের মাধ্যমে দেশের অন্যতম আলোচিত ও হৃদয়বিদারক এক হত্যাকাণ্ডের বিচারিক পরিণতি সামনে এল।
রায় ঘোষণার সময় আসামি আবির আলী আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত শনিবার একই আদালতে মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হয়। মামলায় মোট ৩৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন, যা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছে।
২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম মহানগরীর ইপিজেড থানার নয়ারহাট এলাকায় ঘরের পাশে মসজিদে আরবি পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয় পাঁচ বছরের আয়াত।
প্রথমে এটি নিখোঁজের ঘটনা হিসেবে সামনে এলেও তদন্তের অগ্রগতিতে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ বাস্তবতা।
তদন্তে জানা যায়, মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রতিবেশী আবির আয়াতকে অপহরণ করেন। তবে তাকে কোথাও গোপনে রাখার সুযোগ না পেয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
এরপর অপরাধের ভয়াবহতা আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। তদন্ত অনুযায়ী, হত্যার পর আয়াতের মরদেহ ছয় টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
পরে ৩০ নভেম্বর আউটার রিং রোডের আকমল আলী ঘাটসংলগ্ন স্লুইচ গেটের একটি গর্ত থেকে আয়াতের দুই পা এবং পরদিন খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার গুরুত্ব কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে অপহরণ, মুক্তিপণের উদ্দেশ্য, পরিকল্পিত হত্যা এবং হত্যার পর আলামত গোপনের উদ্দেশ্যে মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করার মতো একাধিক গুরুতর অপরাধের উপাদান রয়েছে।
ফলে আদালতের দেওয়া সর্বোচ্চ শাস্তি অপরাধের প্রকৃতি ও নির্মমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই প্রতীয়মান হয়।
এ ধরনের মামলায় বিচারব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে অপরাধের প্রতিটি ধাপ প্রমাণ করা।
আয়াত হত্যা মামলায় সাক্ষ্য, আলামত, তদন্ত ও আসামির বিরুদ্ধে উপস্থাপিত তথ্যসমূহ আদালতের কাছে অপরাধের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে বলেই রায় থেকে প্রতিফলিত হয়।
শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ সমাজে গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। বিশেষ করে পরিচিত বা প্রতিবেশী কারও হাতে এমন অপরাধ সংঘটিত হলে সামাজিক আস্থার ভিত্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সেই প্রেক্ষাপটে আয়াত হত্যা মামলার রায় কেবল একটি অপরাধের বিচার নয়; এটি শিশু সুরক্ষা, আইনের শাসন এবং নৃশংস অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
আয়াতকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে বিচারিক প্রক্রিয়ার এই পরিণতি অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—পরিকল্পিত ও নির্মম অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আদালত প্রস্তুত।
আলোচিত এই মামলার রায় তাই বিচারপ্রত্যাশী মানুষের কাছে ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচিত হবে।






















আপনার মতামত লিখুন :