মহান মে দিবসে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, অর্জন ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : মে ১, ২০২৬, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন / ০ Views
মহান মে দিবসে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, অর্জন ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ

আজ ১ মে, মহান মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৮৮৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন শ্রমিকেরা।

তাঁদের আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে বিশ্বজুড়ে আজ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে মে দিবস।

শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার এবং মানবিক কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠার এই দিনটি শুধু স্মরণ বা শ্রদ্ধা জানানোর নয়; এটি নতুন করে অঙ্গীকার করারও দিন। কারণ, সভ্যতার প্রতিটি অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, মেধা ও নিরলস পরিশ্রম।

বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার নেপথ্যের কারিগর
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি শ্রমজীবী মানুষ। কৃষি, শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন কিংবা সেবা খাত—সর্বত্রই শ্রমিকদের শ্রম ও নিষ্ঠায় গড়ে উঠেছে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। শহরের উঁচু অট্টালিকা থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি—সবখানেই তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য।

তবে এই বিশাল অবদানের বিপরীতে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার, উপযুক্ত মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সংগ্রাম এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। উন্নয়নের সুফল যেন শ্রমিকদের জীবনেও সমানভাবে প্রতিফলিত হয়, সেটিই আজকের অন্যতম বড় প্রত্যাশা।

এবারের প্রতিপাদ্য: সুস্থ শ্রমিক, সমৃদ্ধ আগামীর অঙ্গীকার
এ বছরের মে দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— “সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত।”

এই প্রতিপাদ্য শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি শ্রমিকের স্বাস্থ্য, দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। সুস্থ শ্রমিকই হতে পারেন টেকসই অর্থনীতি ও সমৃদ্ধ জাতির ভিত্তি।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বার্তা
মহান মে দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর বাণীতে বলেন, দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার মূল কারিগর শ্রমিকরাই। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নে তাঁদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

তিনি বলেন, নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনার মাধ্যমে শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি নারী-পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিতে সরকার বদ্ধপরিকর।

তিনি আরও জানান, প্রবাসী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা জোরদারে সরকার ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

রাজপথে মে দিবসের কর্মসূচি
দিবসটি উপলক্ষে রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আজ শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে শ্রমিক সমাবেশ করবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। এতে প্রথমবারের মতো প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এ আয়োজন শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। শ্রমজীবী মানুষের দাবি, নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনার এখনই উপযুক্ত সময়।

পরিবর্তিত বিশ্বে শ্রমবাজারের নতুন চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তি ও বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা। অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গিগ ইকোনমির প্রসারে কর্মসংস্থানের ধরন বদলে যাচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে নতুন ঝুঁকিও।

শ্রমিক নেতারা বলছেন, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি-সক্ষম কর্মশক্তি গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

সময়ের দাবি: অধিকার, সুরক্ষা ও আইনি সংস্কার
শ্রম আইন সংস্কার, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক শ্রমনীতি ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করাই হতে পারে একটি সত্যিকারের কল্যাণরাষ্ট্রের পরিচয়।

আত্মত্যাগের প্রেরণায় নতুন অঙ্গীকার
মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অধিকার কখনো অনুগ্রহে আসে না; তা অর্জন করতে হয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। শিকাগোর হে মার্কেটের সেই আত্মত্যাগ আজও বিশ্ব শ্রমিক আন্দোলনের অনন্ত প্রেরণা।

বাংলাদেশও এগিয়ে যাবে তখনই, যখন উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকবে শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই রচিত হতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ আগামী।

আজ মহান মে দিবসে সেই প্রত্যয়ই হোক সবার অঙ্গীকার।