কেএসআরএমের রড পেটে ঢুকে মৃত্যু: ‘ময়নাতদন্ত হবে না, লাশ নিয়ে যান’


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : মে ১৬, ২০২৬, ৬:০১ অপরাহ্ন /
কেএসআরএমের রড পেটে ঢুকে মৃত্যু: ‘ময়নাতদন্ত হবে না, লাশ নিয়ে যান’

চট্টগ্রামের কসমোপলিটন আবাসিক এলাকার সেই সড়কে এখনো শুকায়নি রক্তের দাগ। প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে এখনো ভাসছে ভয়াবহ সেই দৃশ্য। খোলা রডবাহী একটি ট্রাক, ছিন্নভিন্ন এক মানবদেহ, আর আতঙ্কে চিৎকার করা মানুষজন।

কিন্তু নিরাপত্তাকর্মী আবদুল মান্নানের (৬১) মর্মান্তিক মৃত্যুর পর এখন আরও ভয়ংকর অভিযোগ উঠেছে।

নিহতের পরিবারের দাবি, দুর্ঘটনার পর আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে উল্টো ময়নাতদন্ত ছাড়াই দ্রুত লাশ দাফনের জন্য চাপ দিয়েছে পুলিশ।

এমনকি থানায় বসে ঘটনাটি ‘ম্যানেজ’ করতে ৮০ হাজার টাকার রফাদফার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা।

ঘটনাটি ঘিরে চট্টগ্রামজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—কার স্বার্থে এত তাড়াহুড়া? কেন একটি বিভৎস ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা?

গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেলে নগরের কসমোপলিটন আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সড়কে ঘটে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কেএসআরএমের রডবোঝাই একটি ট্রাক পেছন থেকে ধাক্কা দেয় নিরাপত্তাকর্মী আবদুল মান্নানকে।

ট্রাকের পেছনে কয়েক ফুট বের হয়ে থাকা খোলা রড তার পেট ভেদ করে শরীরের এক পাশ দিয়ে বেরিয়ে পাশের দোকান পর্যন্ত ঢুকে যায়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি বলেন, জীবনে এত ভয়ংকর দৃশ্য তারা দেখেননি। রক্তে ভেসে যায় পুরো এলাকা। কেউ কেউ ঘটনাটিকে “পশু জবাইয়ের মতো বিভৎস” বলে বর্ণনা করেন।

নিহত আবদুল মান্নান নোয়াখালী সদর উপজেলার বাঁধেরহাট এলাকার মোহাম্মদ খোরশেদের ছেলে। জীবিকার তাগিদে চট্টগ্রামে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি করতেন তিনি।

কিন্তু মৃত্যুর পর শুরু হয় আরেক নাটক—এবার হাসপাতাল ও থানাকে ঘিরে।

নিহতের বোনজামাই মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন অভিযোগ করেন, সকাল থেকেই তারা পাঁচলাইশ থানার পুলিশকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ নেবেন না।

কিন্তু দিনভর শুধু আশ্বাস আর ঘোরানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল পুলিশের ভূমিকা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “সেকেন্ড অফিসার বলেছিলেন, তিনি ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু সারাদিন শুধু ঘুরিয়েছেন।

পরে এসআই আমিনুলের কাছে পাঠালে তিনি বলেন, আজ আর সময় নেই, ময়নাতদন্ত হবে না। এরপর বলেন, ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিয়ে যান।”

বেলায়েতের ভাষ্য, তারা বারবার আপত্তি জানানোর পরও পুলিশ বোঝাতে চেয়েছে, ‘আরটিএ’ (রোড ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্ট) উল্লেখ থাকলে ময়নাতদন্ত ছাড়াও লাশ দাফন করা যাবে। এমনকি থানায় একটি দরখাস্ত দিয়ে লাশ বুঝে নিতে বলা হয়।

তার অভিযোগ আরও গুরুতর। “পুলিশ হয়তো কেএসআরএমের সঙ্গে সমঝোতা করে আমাদের হয়রানি করছে। তারা বুঝাতে চাচ্ছে, ময়নাতদন্ত না হলে মামলা হালকা হবে, ক্ষতিপূরণও এড়ানো যাবে।”

নিহতের ছেলে মোহাম্মদ রাসেলের অভিযোগ আরও বিস্ফোরক। তিনি বলেন, “সকাল থেকে আমাদের বলা হচ্ছিল ময়নাতদন্ত হয়ে গেছে বা হচ্ছে। কিন্তু বিকেলে গিয়ে দেখি, কিছুই হয়নি।

এর মধ্যে থানার পুলিশ সদস্যরা আমাদের ৮০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের কথা বলেছেন। ১১ হাজার টাকা অ্যাম্বুলেন্সসহ খরচ বাবদ দিয়েছেন, বাকিটা পরে দেওয়ার কথা বলেছেন।”

এ অভিযোগ সামনে আসতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—দুর্ঘটনার পর প্রকৃত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণে এত অনীহা কেন?

ফৌজদারি আইনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। বরং এটি একটি স্পষ্ট অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক মৃত্যু। এ ধরনের ঘটনায় সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ হস্তান্তরের সুযোগ নেই।

আইনজীবীদের ভাষ্য, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনই ভবিষ্যৎ বিচার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

মৃত্যুর কারণ, আঘাতের ধরন, অবহেলা বা দায় নির্ধারণ—সবকিছুর ভিত্তি এই প্রতিবেদন। এটি না থাকলে আদালতে মামলা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

কেএসআরএম গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মিজানুল ইসলাম বলেন, “এই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। পুলিশের মাধ্যমে কোনো চাপ দেওয়া বা সমঝোতার বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।”

পাঁচলাইশ থানার এসআই আমিনুল ইসলামও দাবি করেছেন “আমি কখনো বলিনি ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ নিয়ে যেতে।

বরং আমিই ময়নাতদন্ত করার কথা বলেছি। তারাই আমাদের কাছে দরখাস্ত দিয়েছেন। আর টাকা-পয়সার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমি কারও কাছ থেকেই ৮০ পয়সাও নেইনি।”

যদি সত্যিই ময়নাতদন্তের পক্ষে ছিল পুলিশ, তাহলে সারাদিনেও কেন তা সম্পন্ন হলো না?

কেন নিহতের পরিবারকে বারবার ভিন্ন ভিন্ন কথা বলা হলো? আর থানায় বসে ‘ক্ষতিপূরণের আলোচনা’ই বা কেন উঠল?

চট্টগ্রামের আলোচিত এই ঘটনায় এখন শুধু একটি মৃত্যুর বিচার নয়, বরং আইনি প্রক্রিয়া ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও জনমনে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।