ধর্মের বেড়া ভেঙে আজও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন রমেশ শীল-তপন মজুমদার


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : মে ৯, ২০২৬, ৮:০৬ অপরাহ্ন / ০ Views
ধর্মের বেড়া ভেঙে আজও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন রমেশ শীল-তপন মজুমদার

বর্ণাঢ্য আয়োজন আর আবেগঘন স্মৃতিচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পূর্ব গোমদণ্ডী।

বাংলার লোকসংস্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রখ্যাত বাউল ও কবিয়াল রমেশ শীল-এর ১৪৯তম জন্মোৎসব উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী এই আয়োজন যেন হয়ে উঠেছে সংস্কৃতিপ্রেমীদের মিলনমেলা।

শনিবার সকাল ৯টায় কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রথম দিনের কর্মসূচি। নীরবতা আর গভীর শ্রদ্ধার আবহে উপস্থিত মানুষ যেন ফিরে গিয়েছিলেন অতীতের সেই সময়গুলোতে—যেখানে গান, দর্শন আর মানবতার বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন এই মহান কবি।

দিনভর সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় প্রাণ ফিরে পায় অনুষ্ঠানস্থল। কবির লেখা ও সুরে পরিবেশিত গান, কবিগান, মাইজভাণ্ডারী সংগীত এবং আধ্যাত্মিক সুরে এক অনন্য আবহ তৈরি হয়।

লোকসংগীতের প্রতিটি সুর যেন স্মরণ করিয়ে দেয়—রমেশ শীল শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি ছিলেন এক জীবনদর্শনের নাম।

বেলা সাড়ে ১২টায় শুরু হয় আলোচনা সভা, স্মরণসভা ও গুণীজন সংবর্ধনা। রমেশ শীল ট্রাস্টের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মানস চৌধুরীর সার্বিক তত্বাবধানে জন্মবার্ষিকী উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক অ্যডভোকেট প্রকৃতি চৌধুরী ছোটনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় অতিথিদের ফুল ও ক্রেস্ট দিয়ে বরণ করা হয়।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভাইস চেয়ারম্যান তপন মজুমদার।

বক্তব্যে তিনি গভীর আবেগে বলেন, “ধর্মের মধ্যে যে মানবিকতা ও মূল্যবোধ রয়েছে, আমরা তা জীবনে প্রয়োগ করি না। কিন্তু কবিয়াল রমেশ শীল সেই মানবিকতার জীবন্ত উদাহরণ ছিলেন।”

তিনি আরও যোগ করেন, “রমেশ শীল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। একজন হিন্দু হয়েও আজ তার মাজার শরীফ হয়ে উঠেছে—এটাই প্রমাণ করে তিনি মানুষের কবি।”

কালুরঘাট থেকে মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান, বোয়ালখালী থেকে সূর্যসেনের বিপ্লব, প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্তের আত্মত্যাগ—এই মাটির গৌরবের ধারাবাহিকতায় রমেশ শীলের নামও উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়।

প্রধান অতিথি স্থানীয় সংসদ সদস্যের সাথে সমন্বয় করে কবির সমাধি, কমপ্লেক্স ও বাড়ির রাস্তার উন্নয়নের আশ্বাস দেন। এছাড়াও আগামী দু বছরের মধ্যে কবিয়াল রমেশ শীলকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পদকে ভূষিত করার বিশেষ প্রধান মন্ত্রীসহ সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ে আলোচনা করবেন বলেছেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি।

একইসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—আগের সরকারের আমলে “জাতীয় সংসদে হিন্দু ১৭ জন এমপি থাকা সত্ত্বেও রমেশ শীলসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য কিছুই করা হয়নি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৪২ বছর পার হলেও হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের নিজস্ব জমি বা ভবন না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।

জন্মবার্ষিকী উদযাপন পরিষদের সদস্য শিক্ষক ও সাংবাদিক প্রলয় চৌধুরী মুক্তির সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি সাংবাদিক মুস্তফা নঈম।

অতিথি ছিলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সভাপতি ড. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, মাইজভান্ডারী গবেষক ড. সেলিম জাহাঙ্গীর, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক রিংকু শর্মা, লেখক-লোকসংস্কৃতি গবেষক মনিরুল মনির, কবি-গবেষক ও দৈনিক বিজনেস ফাইলের ম্যানেজিং এডিটর শিব শংকর মোদক।

বক্তব্য রাখেন রমেশ ট্রাস্টের সম্পাদক মৃণাল শীল ও জন্মবার্ষিকী উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব প্রকৌশলী রানা শীল মাইকেল।

স্বাগত বক্তব্যে মুস্তফা নঈম বলেন, “উপমহাদেশের বিখ্যাত কবি রমেশ শীলের অনুষ্ঠানে এসে নিজেকে ধন্য মনে করছি। আগামী দেড়শতম জন্মবার্ষিকীকে সামনে রেখে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।”

অন্যান্য অতিথিরাও একমত—রমেশ শীল শুধু অতীতের নন, তিনি ভবিষ্যতেরও পথপ্রদর্শক। তার গান, দর্শন ও জীবনচেতনা বাংলা লোকসংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ।

দিনব্যাপী কবিগান, মাইজভাণ্ডারী সংগীত ও আধ্যাত্মিক গানে মুখর ছিল পুরো প্রাঙ্গণ।

সন্ধ্যায় দেশবরেণ্য শিল্পীদের অংশগ্রহণে গানে গানে কবিকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে শেষ হয় প্রথম দিনের আয়োজন—তবে আবেগের রেশ থেকে যায় দীর্ঘ সময়।

আগামীকাল দ্বিতীয় দিনে আলোচনা সভা এবং সমাপনী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ এরশাদ উল্লাহ।

অতিথি থাকবেন অদুল-অনিতা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অদুল কান্তি চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ফারুক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কানিজ ফাতেমা ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দরা।

এই আয়োজন এক আত্মপরিচয়ের খোঁজ, এক সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ। রমেশ শীলের গান আজও মনে করিয়ে দেয়—ধর্ম নয়, মানুষই শেষ কথা।