
শনিবার উদ্বোধন হবে তেল সরবরাহ কার্যক্রম
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সরবরাহে অত্যাধুনিক মাধ্যম পাইপ লাইন। কিন্তু বাংলাদেশে চলছে ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ জলপথ ও স্থলপথে তেল পরিবহন। অবশেষে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
গত দেড় মাসে পরীক্ষামূলকভাবে চট্টগ্রামের জ্বালানি খাতের সরকারি কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা থেকে পাইপলাইনে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি লিটার ডিজেল।
আগামীকাল শনিবার (১৬ আগস্ট) চূড়ান্ত কমিশনিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের ২৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনে তেল সরবরাহের এ কার্যক্রম উদ্বোধন হবে। পুরোপুরি বাণিজ্যিক অপারেশনে গেলে সময় যেমন সাশ্রয় হবে, তেমনিভাবে বছরে ব্যয় সাশ্রয় হবে প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা।
পতেঙ্গার ডেসপাস টার্মিনালে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পরিবহন নামের ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প শনিবার উদ্বোধন করবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ইন ফি মেজর জেনারেল মু. হাসান জামান।
এর আগে গত ২২ জুন পরীক্ষামূলকভাবে বাণিজ্যিক এই কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে অপারেশনাল দক্ষতা এবং প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জিত হওয়ার পর শুরু হচ্ছে চূড়ান্ত কমিশনিং। পাঁচদিনের মধ্যেই চূড়ান্ত কমিশনিং শেষে পুরোদমে পাইপ লাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহ কাজ শুরু হয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাইপলাইনে জ্বালানি সরবরাহ হলে তা হবে ব্যয় সাশ্রয়ী এবং ঝুঁকিমুক্ত। এতদিন ধরে তেল পরিবাহিত হচ্ছিল সমুদ্র ও স্থলপথে। এতে সিস্টেম লস এবং ঝুঁকিও ছিল।
উদ্বোধনের পর পাইপলাইনে নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা ডিপোতে জ্বালানি তেল পাঠানো হবে। চূড়ান্ত বাণিজ্যিক অপারেশনে গেলে চট্টগ্রাম থেকে প্রতি ঘণ্টায় ২৬০ থেকে ২৮০ মেট্রিক টন ডিজেল যাবে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপোতে।
এ বিষয়ে পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানির প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমিনুল হক জানান, বর্তমানে নৌ ও সড়কপথে ডিজেল পরিবহনে বছরে খরচ হচ্ছে বছরে ৩২৬ কোটি টাকা। পাইপলাইনে জ্বালানি পরিবহন শুরু হলে এই খরচ আর লাগবে না।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লার ডিপো থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন ডিপোতে জ্বালানি তেল পাঠানো যাবে। তবে পাইপলাইনটির রক্ষণাবেক্ষণে বছরে খরচ হবে ৯০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বছরে সাশ্রয় হবে ২৩৬ কোটি টাকা।
নথিপত্র অনুযায়ী, পাইপলাইনের দুটি অংশ রয়েছে। একটি অংশ চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থেকে ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো পর্যন্ত। দ্বিতীয় অংশটি গোদনাইল থেকে ফতুল্লা পর্যন্ত। পাইপলাইন ছাড়াও প্রকল্পের আওতায় বুস্টার পাম্প, ৯টি জেনারেটরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম রয়েছে।
জানা গেছে, পাইপলাইনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল পরিবহনে ২০১৬ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সিস্টেম লস কমানো, পরিবহনে সময় ও খরচ সাশ্রয় এবং ঝুঁকিমুক্ত ভাবে জ্বালানি পরিবহণের জন্য গ্রহণ করা হয় এ প্রকল্প। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে।
প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার পাইপ লাইন স্থাপনসহ যাবতীয় কাজের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়েছে চলতি বছরের মার্চে। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬৯৯ কোটিতে।
পদ্মা অয়েল কোম্পানির তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ কন্সট্রাকশন ব্রিগেডের বাস্তবায়নে নির্মিত হয়েছে এ প্রকল্প।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান জানান, এই পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল লেনদেনের সময় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসেই পুরো পাইপলাইনের তেল সরবরাহ মনিটরিং করা যাবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলে পাইপলাইনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বছরে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টন বা ৩১৭ কোটি লিটার ডিজেল সরবরাহ করা যাবে।
বিপিসি সূত্র জানায়, গত ২২ জুন পরীক্ষামূলকভাবে পাইপে ডিজেল সরবরাহের কাজ শুরু হয়। ৪ আগস্ট পর্যন্ত ৪ কোটি ৮২ লাখ লিটার ডিজেল সরবরাহ করা হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে জ্বালানি সরবরাহ করতে গিয়ে তেমন ত্রুটি পাওয়া যায়নি।
ফলে ১৬ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সরবরাহ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন—এমনটাই কথা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, দেশে বার্ষিক জ্বালানি তেলে চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন, যার বেশিরভাগই ডিজেল। ঢাকা এবং আশপাশের এলাকায় জ্বালানির চাহিদা প্রায় লাখ মেট্রিক টন। এই তেল এখন থেকে পাাইপ লাইনেই পরিবাহিত হবে।
এ প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে ২৭ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা যাবে। আগে যেখানে জল ও স্থলপথে শতাধিক ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে তেল পরিবহন করতে ৪৮ থেকে ৯৬ ঘণ্টা সময় লাগত, এখন সেই পরিমাণ তেল পৌঁছে যাবে মাত্র ১২ ঘণ্টায়।
দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোটাই বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হয়ে জাহাজযোগে এসে পৌঁছায় মহেশখালীর গভীর সমুদ্র এলাকায়। প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা পাইপ লাইনে সেখান থেকে প্রথমে নিয়ে আসা হবে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায়।
পতেঙ্গাতেই রয়েছে দেশের জ্বালানি আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের প্রধান ডিপোগুলো। এসব রিজার্ভ ট্যাংক থেকে পাইপ লাইনে ডিজেল চলে যাবে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়।






















আপনার মতামত লিখুন :