চট্টগ্রামে সংঘাতের নতুন শিকার শিশু, দ্রুত বিচার নিয়ে প্রশ্ন


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : মে ১৯, ২০২৬, ৫:২৮ অপরাহ্ন /
চট্টগ্রামে সংঘাতের নতুন শিকার শিশু, দ্রুত বিচার নিয়ে প্রশ্ন

চট্টগ্রামে বড়দের বিরোধ, পারিবারিক সংঘাত ও সন্ত্রাসী দ্বন্দ্বের ভয়াবহ বলি হচ্ছে শিশুরা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ মে পর্যন্ত নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ছয় শিশু নিহত হয়েছে।

একই সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছে আরও এক শিশু। অধিকাংশ ঘটনায় মামলা হলেও তদন্ত শেষ হয়নি এখনো। এতে বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে।

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও পরিস্থিতিকে গভীর উদ্বেগজনক বলে মনে করছে।

সবশেষ গত ৭ মে নগরের বায়েজিদ এলাকায় পূর্ব বিরোধের জেরে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় ১১ বছরের রেশমী আক্তার। এ ঘটনায় করা মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।

এর আগে ৮ এপ্রিল বাকলিয়া থানার বউবাজার ওসি মিয়া সড়কে পারিবারিক কলহের জেরে নিহত হয় দুই বছর বয়সী আশরাফ বিন সামির।

অভিযোগ রয়েছে, স্ত্রী শারমিন আক্তারের সঙ্গে ঝগড়ার সময় বাবা সজীব শিশুটিকে মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আছড়ে ফেলেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

একই থানার ময়দার মিল এলাকায় ৪ এপ্রিল আধিপত্য বিস্তার নিয়ে স্থানীয় আব্দুস সোবহান ও শওকত গ্রুপের গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয় ১২ বছরের শিশু ফাহিমসহ চারজন। আহত ফাহিম এখনো শরীরে গুলির যন্ত্রণা বহন করছে।

বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, পৃথক দুই ঘটনায় আসামিরা গ্রেপ্তার আছে। একটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে, অন্যটিতে পলাতকদের ধরতে অভিযান চলছে।

গত ১৫ এপ্রিল হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের চারিয়া এলাকায় স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার জেরে দুই মাস বয়সী শিশু মেহেরা আক্তারকে আছড়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে বাবা ওসমান গণির বিরুদ্ধে।

২০ জানুয়ারি মিরসরাইয়ে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে খুন হয় তিন বছরের শিশু নূর আবদুল্লাহ।

আর ৩ জানুয়ারি নগরের খুলশী লালখান বাজার পানির ট্যাংকি এলাকায় ১২ বছরের শিশু শ্রাবন্ত ঘোষের গলায় ওড়না পেঁচানো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত শিশু হত্যার ঘটনা ঘটে সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকায়।

২৮ ফেব্রুয়ারি সাত বছরের জান্নাতুল নাইমা হীরামনিকে গলার শ্বাসনালি কাটা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পাঁচ দিন পর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

পুলিশ জানায়, শিশুটির বাবার সঙ্গে বিরোধের জেরে বাবু শেখ নামের এক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণচেষ্টা চালিয়ে পরে হত্যা করেন। গ্রেপ্তারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন তিনি।

এদিকে ২০২২ সালের বহুল আলোচিত মারজান হক বর্ষা হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়াও এখনো শেষ হয়নি।

ওই বছরের ২৪ অক্টোবর জামালখান লিচুবাগান এলাকায় চিপস কিনতে গিয়ে নিখোঁজ হয় সাত বছরের বর্ষা। তিন দিন পর নালা থেকে উদ্ধার করা হয় তার লাশ। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার চার্জ গঠন হয়নি।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব আইনজীবী এ এম জিয়া হাবীব আহসান বলেন, একটি মামলার চার্জশিট দিতে অনেক সময় তিন বছর পর্যন্ত লেগে যায়।

বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় সাক্ষীরা স্থান পরিবর্তন করেন, নষ্ট হয়ে যায় আলামত। ফলে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ অপরাধ প্রমাণে ব্যর্থ হয় এবং আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।

তিনি বলেন, শিশু হত্যা ও ধর্ষণের মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এনে তিন মাসের মধ্যে অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতা, স্থানীয় আধিপত্য, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মিলেই শিশুদের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠছে সমাজ।

তাদের মতে, কেবল মামলা দায়ের নয়—দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে।