
নির্বাচনে অস্বচ্ছতার অভিযোগে মাত্র ছয় মাসের মাথায় ভেঙে দেওয়া হয়েছে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ।
বোর্ড পরিচালনার দায়িত্বে গঠিত হয় নতুন অ্যাডহক কমিটি। বাংলাদেশের প্রাক্তন অধিনায়ক তামিম ইকবালের ঘাড়েই আপাতত দেশের ক্রিকেটের দায়িত্ব। তাঁর নেতৃত্বে ১১ জনের অ্যাডহক কমিটি কাজ চালাবে আগামী তিন মাস।
অ্যাডহক কমিটিতে তামিমের নেতৃত্বে কাজ করবেন বর্তমান শাসক দলের নেতাদের স্ত্রী ও সন্তানরা।
তাদের মধ্যে আইনজীবী রাশনা ইমাম বিএনপির সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজের স্ত্রী। কমিটিতে আছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে সাঈদ ইব্রাহিম আহমদ ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের ছেলে ইসরাফিল খসরু।
এছাড়াও অ্যাডহক কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে আছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন, জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার আতহার আলী খান, এর আগে বিভিন্ন সময়ে বিসিবির পরিচালনা পর্ষদে থাকা তানজিল চৌধুরী, সালমান ইস্পাহানি, রফিকুল ইসলাম ও ফাহিম সিনহা।
এদিকে নতুন দায়িত্ব পাওয়ার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যই গতকাল মঙ্গলবার রাতে বিসিবি কার্যালয়ে আসেন তামিম। মিরপুরের বিসিবি কার্যালয়ের সামনে তখন ছোট ছোট জটলা। শত শত মানুষের ভিড়। কারও কারও কণ্ঠে স্লোগান। তামিম ইকবালের নেতৃত্বে বিসিবির নতুন অ্যাডহক কমিটিকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছেন তাঁরা।
কালো ব্লেজার পরে গাড়ি থেকে নামতেই তামিমকে ঘিরে ধরে অসংখ্য ক্যামেরা। অবশ্য খেলোয়াড়ি জীবনের শুরু থেকে তারকাখ্যাতি পাওয়া এই সাবেক অধিনায়ক তাতেই অভ্যস্ত।
ভিড় পেরিয়ে বিসিবি কার্যালয়ে গিয়ে তামিম বসেন সভাপতির চেয়ারে। পরে অ্যাডহক কমিটির ১১ সদস্য নিয়ে বোর্ড সভায় বসেন তামিম।
সভা শেষে জানানো হয়, আইসিসি ও এসিসিতে তামিমকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বোর্ডের মুখপাত্র করা হয়েছে তানজিল চৌধুরীকে।
ছোট্ট প্রতিক্রিয়ায় এই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে আশাবাদী তামিম, বলেন, ‘সাধারণত এমন দায়িত্ব পেলে অনেকেই ডেভেলপমেন্টসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন; কিন্তু আমি ও আমার দল একসঙ্গে অনুভব করছি— আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সুনাম পুনরুদ্ধার করা। গত দেড় বছরে যে সুনামের ক্ষতি হয়েছে, সেটি ঠিক করাই আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।’
তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন সম্পর্কে তামিম বলেন, অ্যাডহক কমিটির কেউ চাইলে নির্বাচন করতে পারেন। তিনি নিজে নির্বাচন করবেন জানিয়ে তামিম বলেন, ‘আমরা চাই, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হোক, যেখানে আগ্রহী সবাই অংশগ্রহণ করবেন—ক্রিকেটার, সংগঠক, সংশ্লিষ্ট সবাই।’
আগের ১২ বছরে একজন পাপনকে সভাপতি হিসেবে দেখা বিসিবি গত ২০ মাসেই নেতৃত্বে পেয়েছে তিনজনকে। তামিমের আগের দুজন আমিনুল আর ফারুকও তাঁর মতোই ছিলেন সাবেক অধিনায়ক।
তাদের ব্যর্থতা নিয়ে সরব তামিমের কাঁধে এবার এসে পড়েছে ক্রিকেট বোর্ডের ভার। যে চ্যালেঞ্জটা তিনি নিজেই নিতে চাইছিলেন অনেক দিন ধরে।
এর আগে গত বছরের ৬ অক্টোবরের সর্বশেষ পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে বেশ তোড়জোড় করেই বোর্ড পরিচালক হতে মাঠে নেমেছিলেন তামিম। বোর্ড সভাপতি হওয়ার লক্ষ্যের কথাও জানিয়ে দিয়েছিলেন পরিষ্কার। কিন্তু নির্বাচনী ‘কৌশলে’ ঠিক পেরে ওঠেননি। যে কারণে শেষ মূহূর্তে জোটবদ্ধভাবে সরে দাঁড়ান নির্বাচন থেকে।
কিন্তু সব ডিঙিগয়ে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। বিসিবি সভাপতি হয়েছিলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম। তবে সে নির্বাচন নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। অনিয়ম দুর্ণীতিরও অভিযোগ ওঠে।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে সরকারি হস্তক্ষেপ, ই-ভোটিং নিয়ে কারচুপি এবং বুলবুলের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের কথা জানিয়ে বিসিবির সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি ভেঙ্গে দেয় সরকার। তামিম ইকবালকে প্রধান করে ১১ সদস্যের অ্যাড-হক কমিটি গঠন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)।
ঢিমেতালে চলা বিসিবির এ কমিটি ভেঙে যেতে পারে, এমন গুঞ্জন কয়েক দিন ধরেই ছিল। তবে তা যে এত দ্রুত হবে, সেটি সম্ভবত ভাবতে পারেননি আমিনুলের বোর্ডের পরিচালকেরা।
এনএসসির পরিচালক (ক্রীড়া) আমিনুল এহসান জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটি নাকি বিসিবির তিন ক্যাটাগরির নির্বাচনেই অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে।সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ‘অযৌক্তিক’ হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়ার কথাও আছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
আমিনুল এহসান জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ২০১৮ সালের জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নীতিমালার ২১ ধারা অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, এনএসসি তাদের অধীন কোনো ক্রীড়া সংস্থায় অনিয়ম খুঁজে পেলে যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারে।
এদিকে গতকাল রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিজেকে এখনো ‘বিসিবি সভাপতি’ দাবি করে আমিনুল ইসলাম তদন্ত প্রতিবেদনকে ‘তথাকথিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবরের নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে অবিলম্বে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপের আহ্বানও জানিয়েছেন আমিনুল ইসলাম।
এখন তিন মাসের জন্য অ্যাডহক কমিটির প্রধান হয়ে তামিম আপাতত লক্ষ্য ঠিক করেছেন দুটি— বিসিবির ‘হারানো’ সুনাম ফেরানো এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন। তিনি তাতে কতটা সফল হবেন, সে প্রশ্নের উত্তর সময়ের হাতেই তোলা থাকল।






















আপনার মতামত লিখুন :