
চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় যা ঘটছে, তা শুধু একটি স্থানীয় বিক্ষোভ নয়। এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের গভীর আস্থাসঙ্কটের এক উন্মুক্ত প্রকাশ।
একীভূত হয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’-এর বিরুদ্ধে আমানতকারীদের ক্ষোভ এখন সরাসরি রাস্তায় নেমে এসেছে।
সোমবার (৪ মে) সকালে আগ্রাবাদ আক্তারুজ্জামান সেন্টার এলাকায় শত শত আমানতকারী সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল এবং মানববন্ধনের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ জানান।
“বাংলাদেশ ব্যাংক ভুক্তভোগী আমানতকারী এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম বিভাগ”-এর ব্যানারে সংগঠিত এই কর্মসূচি দ্রুতই রূপ নেয় প্রতীকী কিন্তু শক্তিশালী প্রতিবাদে। ব্যাংকের শাখায় শাখায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তালা।
বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা পর্যায়ক্রমে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের শাখাগুলোতে গিয়ে তালা লাগান।
আগের দিনও খাতুনগঞ্জে একই ধরনের কর্মসূচি পালনের পর সোমবার ছিল আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন। আর তাতেই স্পষ্ট, এই ক্ষোভ আর সাময়িক নয়।
আন্দোলনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা। গ্রাহকদের অভিযোগ, তাদের আমানতের ওপর দুই বছর ধরে কোনো মুনাফা দেওয়া হয়নি, এমনকি ২০২৮ সালের আগে টাকা উত্তোলনেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘হেয়ারকাট’। অর্থাৎ জমাকৃত অর্থের একটি অংশ কেটে নেওয়ার সম্ভাবনা। যা আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বিভাগের সাধারণ সম্পাদক মো. আজম উদ্দীন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শান্তিপূর্ণ দাবি জানিয়ে কোনো ফল না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে কঠোর কর্মসূচিতে গেছেন। তার ভাষায়, “এটি আমাদের জমানো টাকার ওপর সরাসরি আঘাত।”
এই পরিস্থিতির শিকড় আরও গভীরে। এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, তারল্য সংকট এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত একীভূত করার সিদ্ধান্তে পৌঁছায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু একীভূতকরণ। যা সাধারণত সংকট নিরসনের পথ হিসেবে বিবেচিত—এখানে উল্টো নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
একীভূত হওয়ার পরও গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা, মুনাফা বন্ধ এবং সম্ভাব্য কর্তনের সিদ্ধান্ত। এসব মিলিয়ে আস্থা পুনর্গঠনের বদলে অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কিছু শাখার তালা খুলে দেওয়া হলেও পরিস্থিতি মোটেই স্বাভাবিক হয়নি। বরং আন্দোলনকারীরা আরও বড় কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। চট্টগ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণাও এসেছে।
এই ঘটনাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—ব্যাংকে রাখা আমানত কি এখনো নিরাপদ? একীভূতকরণ কি সমাধান, নাকি সমস্যার সাময়িক আড়াল? আর সবচেয়ে বড় কথা—আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
তালাবদ্ধ ব্যাংক শাখাগুলো এখন শুধু ঘটনার চিত্র নয়। এগুলো একটি ভেঙে পড়া বিশ্বাসের প্রতীক। যতদিন না আমানতকারীরা তাদের টাকার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছেন, ততদিন এই আন্দোলন থামার সম্ভাবনা ক্ষীণ।






















আপনার মতামত লিখুন :