মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে চট্টগ্রামের আধিপত্যে ধস,


Rajib Sen Prince প্রকাশের সময় : জুন ৬, ২০২৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ন /
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে চট্টগ্রামের আধিপত্যে ধস,

একসময় মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম।

দীর্ঘদিন ধরে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যায় দেশের শীর্ষ জেলাগুলোর মধ্যে অবস্থান করলেও গত কয়েক বছরে সেই চিত্র বদলে গেছে।

জনশক্তি রপ্তানির প্রতিযোগিতায় এখন চট্টগ্রামকে ছাড়িয়ে গেছে কুমিল্লা। শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়াও। সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদপুরও অনেক ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।

জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০০৫ সালের আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যায় শীর্ষে ছিল চট্টগ্রাম জেলা।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুরের উত্থান শুরু হয়। বিশেষ করে ২০১৯ সালের পর থেকে চট্টগ্রাম থেকে জনশক্তি রপ্তানির প্রবণতা নিম্নমুখী হতে থাকে।

ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মের (ওইপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে চাকরির উদ্দেশ্যে বিদেশ গেছেন ৮৭ হাজার ৫২৪ জন।

একই সময়ে কুমিল্লা থেকে গেছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩৩ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৮ জন এবং চাঁদপুর থেকে ৮৪ হাজার ৯২৪ জন।

পরিসংখ্যান বলছে, ব্যবধান শুধু বাড়ছেই। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের হিসাবেই দেখা যায়, বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যায় চট্টগ্রামকে বড় ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেছে কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

এমনকি ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত সামগ্রিক হিসাব ধরলে চাঁদপুরও চট্টগ্রামের চেয়ে এগিয়ে অবস্থান করছে।

২০২৩ সালে চট্টগ্রাম থেকে বিদেশ গেছেন ৭ হাজার ৪০৮ জন। একই সময়ে কুমিল্লা থেকে ১৫ হাজার ১৩৮ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১৪ হাজার ৬৫৩ জন এবং চাঁদপুর থেকে ১ হাজার ৪৪ জন বিদেশে যান।

২০২৪ সালে চট্টগ্রাম থেকে বিদেশ যান ৩৮ হাজার ১৬২ জন। কুমিল্লা থেকে ৭৩ হাজার ৭৩৩ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৫৯ হাজার ৯২৭ জন এবং চাঁদপুর থেকে ৪০ হাজার ৭৫৪ জন।

২০২৫ সালে চট্টগ্রাম থেকে বিদেশ পাড়ি দেন ৪১ হাজার ৮৩৩ জন। একই সময়ে কুমিল্লা থেকে ৭৬ হাজার ৫০১ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৬৭ হাজার ২১৭ জন এবং চাঁদপুর থেকে ৪২ হাজার ৯৮২ জন বিদেশে যান।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে গেছেন ১২১ জন। একই সময়ে কুমিল্লা থেকে ২৬১ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৫৪১ জন এবং চাঁদপুর থেকে ১৪৪ জন বিদেশে গেছেন।

ওমান–দুবাই নির্ভরতার মূল্য:
জনশক্তি রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, চট্টগ্রামের বিদেশগামীদের বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানমুখী।

বিশেষ করে দুবাই ও ওমানে চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ও সামাজিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। নতুন কর্মপ্রার্থীরাও পরিচিতজনদের মাধ্যমে ওই দুই দেশে যাওয়াকেই বেশি নিরাপদ ও সুবিধাজনক মনে করেন।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসব গন্তব্যে ভিসা প্রক্রিয়া সীমিত হওয়া কিংবা ধীরগতির কারণে বিদেশযাত্রার প্রবণতায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। ফলে চট্টগ্রাম থেকে জনশক্তি রপ্তানির গতি কমে এসেছে।

বর্তমানে সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারে কিছু কর্মী গেলেও তা আগের শূন্যতা পূরণ করার মতো নয়।

‘চট্টগ্রামের মানুষ নির্দিষ্ট দেশেই যেতে চায়’:
জনশক্তি ও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে এক দশকের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করা এবং বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে কর্মরত জহিরুল আলম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে কর্মী গেলেও চট্টগ্রামের মানুষের ঝোঁক মূলত মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের দিকে। সূত্র-বিডিনিউজ

তার ভাষায়, “বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে কর্মী যায়। তবে চট্টগ্রামের লোক যায় মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট কিছু দেশে, যেগুলোর মধ্যে অন্যতম ওমান ও দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত)। এসব দেশে ভিসা বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম থেকে জনসংখ্যা রপ্তানি কমেছে।”

তিনি জানান, ওমানে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের প্রায় ৬০ শতাংশই চট্টগ্রাম অঞ্চলের।

জহিরুল আলম মজুমদারের পর্যবেক্ষণ, চট্টগ্রামের মানুষ আঞ্চলিক যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে যেখানে আগে থেকেই নিজ এলাকার মানুষের উপস্থিতি বেশি, সেখানেই যেতে আগ্রহী হয় তারা।

তার ভাষায়, “চট্টগ্রামের লোকজন আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দেয়। অন্য জেলার লোকজন কাজের সুবাদে যেকোনো দেশে যেতে আগ্রহী। তবে সেক্ষেত্রে চট্টগ্রামের লোকজন একটু ব্যতিক্রম। তারা নিজ এলাকার লোকজন যে দেশে বেশি, সেখানেই মূলত যেতে চান।”

পেশা নির্বাচনে সীমাবদ্ধতা?
বিএমইটির এই কর্মকর্তার মতে, বিদেশে গিয়ে সব ধরনের পেশায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে তুলনামূলক অনীহা রয়েছে।

তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের লোকজন সচরাচর সব ধরনের কাজ করতে চান না। তারা মূলত ব্যবসা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে আগ্রহী। দুবাই, ওমানে চট্টগ্রামের লোকজন বেশি থাকায় সেদিকে যাবার প্রবণতাও বেশি।”

অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (অ্যাটাব) সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবু জাফরও একই ধরনের মূল্যায়ন দেন।

তার মতে, “চট্টগ্রামের লোকজন মূলত যেতে চান ওমান, দুবাই, কুয়েত ও সৌদি আরব। এসব দেশগুলোতে ভিসা বন্ধ থাকায় বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের লোকজনের সংখ্যা কমেছে।”

তিনি আরও বলেন, “চট্টগ্রামের লোকজন সব ধরনের পেশায় কাজ করতে চান না। আর চাকরির উদ্দেশ্যে কম যান। তারা যেতে চান ব্যবসা করতে। আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে তারা গিয়ে ব্যবসা বাণিজ্যে যুক্ত হয়ে যান।”

স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রভাব:
চট্টগ্রামের অবস্থান পিছিয়ে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ।

বিএমইটির কর্মকর্তা জহিরুল আলম মজুমদার বলেন, শিল্পায়ন ও কারখানা বৃদ্ধির ফলে চট্টগ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে। ফলে অনেকেই বিদেশে যাওয়ার পরিবর্তে দেশেই কাজ খুঁজে নিচ্ছেন।

তার ভাষায়, “চট্টগ্রামে বিভিন্ন ধরনের কারখানা গড়ে উঠেছে। সেগুলোতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে কাজের ক্ষেত্রও বেড়েছে। কেউ এক পেশায় থাকলে, সে অন্য পেশায় সহজেই যেতে পারছে। যেটা অন্য অঞ্চলের ক্ষেত্রে সম্ভব হয়ে উঠে না।”

অ্যাটাবের সাবেক চেয়ারম্যান আবু জাফরও একই বিষয় তুলে ধরে বলেন, চট্টগ্রামে আয়ের বিকল্প উৎস তুলনামূলক বেশি। ফলে কম মজুরির শ্রমবাজারে যাওয়ার আগ্রহও কম।

তিনি বলেন, “চট্টগ্রামে কাজের বিভিন্ন সোর্স আছে, যেটা অন্য জেলার লোকজনের নেই। অনেক দেশ আছে দৈনিক ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা মজুরিতে কাজ করতে হয়। এসব দেশে চট্টগ্রামের লোকজন যায় না, কারণ দেশে তার আয়-রোজগার আরও বেশি হয়।”

বদলে যাওয়া বাস্তবতা:
একসময় মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে চট্টগ্রামের নাম ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী ব্র্যান্ডগুলোর একটি। কিন্তু শ্রমবাজারের পরিবর্তন, নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর অতিনির্ভরতা, পেশাগত বৈচিত্র্যের অভাব এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

পরিসংখ্যানের ভাষায়, বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যার দৌড়ে চট্টগ্রাম এখনও গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা। কিন্তু নেতৃত্বের আসনটি এখন আর তার দখলে নেই।

জনশক্তি রপ্তানির নতুন মানচিত্রে কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া এগিয়ে গেছে, আর চট্টগ্রামকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়াতে হচ্ছে।