
টানা কয়েক দিনের বর্ষণে পাহাড়ের মাটি যখন নরম হচ্ছিল, তখনো হয়তো ১০ মাসের শিশু আশরাফুল ইসলাম তানভীরের বাবা-মা ভাবেননি এই মাটিই তাঁদের পৃথিবী অন্ধকার করে দেবে।
বুধবার (৮ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকার খেজুরতলা সংলগ্ন বাগানবাড়িতে ঘটে গেল এক চরম ট্র্যাজেডি।
পাহাড়ধসে বসতঘর ভেঙে মাটিচাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছে ১০ মাস বয়সী অবুজ শিশু তানভীর।
এই ঘটনায় আহত হয়েছেন তার মা-ও, তবে তাঁর শারীরিক ক্ষতের চেয়ে কোল খালি হওয়ার মানসিক ক্ষত এখন বহুগুণ ভারী।
নিহত তানভীর ওই এলাকার বাগানবাড়ি এলাকার বাসিন্দা মহিন উদ্দীনের ছেলে। তাদের মূল বাড়ি জাফরাবাদ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ঘেঁষা এলাকার মাটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল।
বুধবার সকালে হঠাৎ করেই পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে মহিন উদ্দীনের বসতঘরের ওপর আছড়ে পড়ে। মুহূর্তে মাটির নিচে চাপা পড়ে ঘরের ভেতর মায়ের কোলঘেঁষে থাকা ছোট্ট তানভীর।
প্রতিবেশীরা ছুটে এসে দ্রুত তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তানভীরকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় শিশুটির মা সামান্য আহত হয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
তবে চোখের সামনে কলিজার টুকরোকে হারানোর স্তব্ধতা যেন তাঁকে পাথর করে দিয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে যথারীতি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
তারা তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং পাহাড়ধসের সঠিক কারণ খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন-প্রতিবার মৃত্যুর পরই কেন প্রশাসনকে তৎপর হতে দেখা যায়?
জঙ্গল সলিমপুরের এই ছিন্নমূল এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই যেন এক ‘মৃত্যুকূপ’। পাহাড় কেটে, পাহাড়ের খাঁজে চরম ঝুঁকি নিয়ে এখানে বছরের পর বছর বসবাস করছে অসংখ্য পরিবার।
বর্ষা মৌসুম এলেই এই এলাকাগুলোতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা শতগুণ বেড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি অপসারণ এবং এই মানুষগুলোকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের দাবি তারা বহুবার জানিয়েছেন।
কিন্তু প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের অভাব ও উদাসীনতায় প্রতি বছরই বর্ষা এলে কোনো না কোনো মায়ের কোল খালি হয়, গণমাধ্যমের শিরোনাম হয় ক্ষণিকের কান্না।
১০ মাসের তানভীরের এই অকাল চলে যাওয়া কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের পাহাড় ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসন নীতির ব্যর্থতার এক জীবন্ত দলিল।






















আপনার মতামত লিখুন :