
বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে নিজেদের আধিপত্যের গল্পটা আরও দীর্ঘ করল ফ্রান্স। টানা দুই বিশ্বকাপের ফাইনালিস্টরা এবারও নকআউট পর্বে উঠল দাপট দেখিয়েই।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে ২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আর সেই জয়ের নায়ক কিলিয়ান এমবাপে।
জোড়া গোল করে তিনি যেমন দলের জয় নিশ্চিত করেছেন, তেমনি গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও ছয় গোল নিয়ে লিওনেল মেসির পাশে উঠে এসেছেন।
ফ্রান্সের আক্রমণের ধার আরও শাণিত করেছেন মাইকেল অলিস। দুইটি অ্যাসিস্ট করে পুরো ম্যাচজুড়ে সুইডেনের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখেছেন তিনি।
অলিস-এমবাপে জুটির দুর্দান্ত বোঝাপড়াই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়।
প্রথমার্ধে অবশ্য গোলের দেখা পেতে ফ্রান্সকে অপেক্ষা করতে হয়েছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। শুরু থেকেই একের পর এক আক্রমণ চালিয়েও ভাগ্য যেন সঙ্গ দিচ্ছিল না।
অফসাইডের কারণে এমবাপের একটি গোল বাতিল হয়। এরপর দুইবার বল লেগেছে গোলপোস্টে, কয়েকটি শট অল্পের জন্য বাইরে গেছে। তবু ফরাসিদের আক্রমণের তীব্রতা কমেনি।
অবশেষে ৪৫তম মিনিটে আসে প্রতীক্ষিত সেই মুহূর্ত। বক্সের বাঁ প্রান্তে বল পেয়ে দুর্দান্ত পায়ের কারিকুরিতে নিজের মার্কারকে কাটিয়ে কাছাকাছি দূরত্ব থেকে দূরের পোস্ট ঘেঁষে জালে বল পাঠান এমবাপে।
গোল করার পর তিনি ছুটে যান সম্প্রতি মাকে হারিয়ে কঠিন সময় পার করা কোচ দিদিয়ের দেশমকে জড়িয়ে ধরতে। আবেগঘন সেই মুহূর্তে শেষ হয় প্রথমার্ধ, ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় ফ্রান্স।
প্রথমার্ধে সুইডেনও কয়েকটি আক্রমণ তুলেছিল। তবে ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইগনানকে বড় কোনো পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি তারা।
ম্যাচের ১৭তম মিনিটে এমবাপের প্রথম প্রচেষ্টা সহজেই ঠেকিয়ে দেন সুইডেনের গোলরক্ষক জেটারস্ট্রম।
তিন মিনিট পর বারকোলার শক্তিশালী শট চলে যায় গোলবারের ওপর দিয়ে। ২১তম মিনিটে অলিসের পাস থেকে মাঝমাঠ ছুটে গিয়ে বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে এমবাপের গোলটি বাতিল হয়।
হাইড্রেশন ব্রেকের পর রাবিওর শট রুখে দেন জেটারস্ট্রম। ৩৩তম মিনিটে অলিসের নিখুঁত পাস থেকে এমবাপের দারুণ শট লেগে ফিরে আসে পোস্টে। পরের মিনিটে রাবিওর আরেকটি প্রচেষ্টা চলে যায় ওপর দিয়ে। ৩৭তম মিনিটে তার চমৎকার ওভারহেড কিকও পোস্টে আঘাত হানে।
ফিরতি বলে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি উসমান দেম্বেলে। বিরতির দুই মিনিট আগে অলিসের শট অল্পের জন্য বাইরে যাওয়ার পরই এমবাপের গোলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফ্রান্স।
এই গোলটি ছিল বিশ্বকাপে এমবাপের ১৭তম। চলতি আসরে এটি ছিল তার পঞ্চম গোল, যার মাধ্যমে তিনি নরওয়ের আর্লিং হালান্ডের পাশে জায়গা করে নেন।
বিরতির পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে ফ্রান্স। ৫৩তম মিনিটে অলিসের দারুণ পাস থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন বারকোলা।
এরপর ৭৪তম মিনিটে আবারও অলিসের অ্যাসিস্ট থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন এমবাপে। প্রথম গোলের মতো এবারও বক্সের বাঁ প্রান্ত থেকে জোরালো শটে জাল কাঁপান রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা।
বিশ্বকাপে এটি ছিল এমবাপের ১৮তম গোল। সর্বকালের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা লিওনেল মেসির ১৯ গোলের রেকর্ড থেকে তিনি এখন মাত্র এক গোল দূরে।
এর আগে এমবাপে ও অলিস—দুজনেরই আরও কয়েকটি নিশ্চিত সুযোগ ঠেকিয়ে দেন জেটারস্ট্রম। ৮৬তম মিনিটে দুজনই বদলি হয়ে মাঠ ছাড়েন।
পরিসংখ্যানেও ছিল ফ্রান্সের পূর্ণ আধিপত্য। পুরো ম্যাচে তারা ২৫টি শট নেয়, যার ১২টি ছিল লক্ষ্যে।
বিপরীতে সুইডেনের শট মাত্র ৮টি। জেটারস্ট্রম একাই ৯টি সেভ করে ব্যবধান আরও বড় হওয়া থেকে দলকে বাঁচান।
শেষ ষোলোতে এবার ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ হবে জার্মানিকে বিদায় করা প্যারাগুয়ে। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম শিরোপা জয়ের পথে শেষ ষোলোতে এই প্যারাগুয়েকেই ১-০ গোলে হারিয়েছিল ফ্রান্স।
প্রায় তিন দশক পর আবারও বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল।
বর্তমান ফর্ম, আক্রমণের ধার এবং এমবাপে-অলিস জুটির বোঝাপড়া বিবেচনায় প্যারাগুয়ের সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন এক পরীক্ষা।
আর ফ্রান্সও যেন স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল—বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের শিরোপা অভিযানের গতি এখনও থামেনি।






















আপনার মতামত লিখুন :