
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে (চসিক) আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার ঘোষণা দিয়ে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট সংস্থাগুলোর প্রতি কঠোর বার্তা দিলেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তাঁর ভাষায়, নগরবাসীর ওপর অযৌক্তিক করের বোঝা চাপিয়ে নয়, বরং দীর্ঘদিনের বকেয়া রাজস্ব আদায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ফিরিয়েই গড়ে তোলা হবে একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর সিটি করপোরেশন।
এই বার্তাকেই সামনে রেখে মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১টায় নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২ হাজার ২৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেন মেয়র।
একই অনুষ্ঠানে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ হাজার ৬৬৫ কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ টাকার সংশোধিত বাজেটও উপস্থাপন করা হয়।
গত অর্থবছরে ঘোষিত মূল বাজেট ছিল ২ হাজার ১৪৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
নিজের মেয়াদে দ্বিতীয় বাজেট ঘোষণা করে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরবাসীর প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে চট্টগ্রামকে একটি ক্লিন-গ্রিন, হেলদি ও সেইফ সিটি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ, বাসযোগ্য ও নান্দনিক পর্যটন নগর হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তবে তাঁর বাজেট বক্তৃতার সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল রাজস্ব আদায় নিয়ে দেওয়া কঠোর অবস্থান।
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করাই আমার লক্ষ্য।
অতীতে অযৌক্তিকভাবে যেসব গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেগুলো যৌক্তিক করতে নিয়মিত রিভিউ বোর্ড বসানো হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে সঠিক ও ন্যায্যভাবে কর নির্ধারণ করা হচ্ছে।’
একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ‘বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
বন্দর, রেলওয়ে, ৩৬টি কনটেইনার টার্মিনাল ও অয়েল কোং লিমিটেডসহ বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট সংস্থাগুলোকে অবশ্যই তাদের নিকট প্রাপ্য রাজস্ব পরিশোধ করতে হবে। কারণ রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।’
মেয়রের এই বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে, সাধারণ নাগরিকের করকে যৌক্তিক করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বকেয়া রাজস্ব আদায়কেই এবার অগ্রাধিকার দিচ্ছে চসিক।
প্রস্তাবিত বাজেটে আয় ও ব্যয়ের বড় অংশই উন্নয়নকেন্দ্রিক। এবারও সর্বোচ্চ ৯৭৫ কোটি টাকা আয় ধরা হয়েছে উন্নয়ন অনুদান খাতে।
এছাড়া হার কর ও অভিকর খাতে ৪২৬ কোটি টাকা এবং বকেয়া কর খাতে ১৯৭ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ৮২৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছে উন্নয়ন খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৮০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বেতন-ভাতা ও পারিশ্রমিকের জন্য।
বাজেটের এই বিন্যাস থেকে স্পষ্ট, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার সম্প্রসারণকে সামনে রেখেই ব্যয়ের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
শুধু অবকাঠামো নয়, নগর পরিচালনায় প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক প্রশাসন গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন মেয়র। তাঁর মতে, একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক সিটি করপোরেশন গড়ে তুলতে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
সেই লক্ষ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনায় চারটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এগুলো হলো— চলমান নিয়োগ কার্যক্রম স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, বর্তমান কাজের পরিধি ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়ন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সব কার্যক্রম ধাপে ধাপে ডিজিটালাইজেশন করা।
চসিকের নতুন বাজেটে উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা তুলে ধরা হলেও এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি। আর সে কারণেই বাজেট বক্তৃতায় বারবার উঠে এসেছে প্রাপ্য কর আদায়ের বিষয়টি।
মেয়রের বার্তা স্পষ্ট— সাধারণ নাগরিকের ওপর অযৌক্তিক চাপ নয়, বরং যেসব বড় প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর সিটি করপোরেশনের প্রাপ্য রাজস্ব পরিশোধ করেনি বা বকেয়া রেখেছে, তাদের কাছ থেকেই আদায় নিশ্চিত করতে চায় চসিক।
স্বাবলম্বী সিটি করপোরেশনের যে প্রতিশ্রুতি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দিয়েছেন, তার সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে ঘোষিত বাজেটের বাস্তবায়ন, রাজস্ব আহরণে কঠোরতা এবং নগরবাসীর প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবার মান কতটা বাড়ানো যায়— তার ওপরই।






















আপনার মতামত লিখুন :